মঙ্গলবার ২০ এপ্রিল ২০২১ ৭ বৈশাখ ১৪২৮

মঙ্গলবার ২০ এপ্রিল ২০২১

মীলাদুন্নবী ﷺ এঁর উদযাপন ইজমা দ্বারা প্রমাণিত
মাহমুদ হাছান
প্রকাশ: শনিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১০:৩১ এএম আপডেট: ০২.১২.২০১৭ ১০:৫৩ এএম  Count : 520

তাফসীরে রুহুল বয়ানে উল্লেখ করা হয়েছে, 
‘‘পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর অনুষ্ঠান বর্তমানকার প্রচলিত নিয়মে আনুষ্ঠানিকভাবে আরম্ভ হয় ৬০৪ হিজরীতে। 
হযরত ইমাম তক্বিউদ্দীন সুবকী মিশরী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি ছিলেন ওই যুগের শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ ও ইমাম। একদিন তাঁর দরবারে ওই যুগের বিখ্যাত ওলামা-ই কেরামের সমাবেশ ঘটেছিলো। 
ইমাম তক্বিউদ্দীন রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁদের উপস্থিতিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর প্রশংসায় ইমাম সরসরী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি কর্তৃক রচিত দু’ লাইন কবিতা পাঠ করেন।
চরণ দু’টি ছিল নিন্মরূপঃ
قَلِیْلٌ لِمَدْحِ الْمُصْطَفٰی اَلْخَطُّ بِالذَہَبٖ ۔عَلٰی وَرَقٍ مِّنْ خَطٍّ اَحْسَنُ مِنْ کُتُبٖ
وَاَنْ تَنْہَضَ الْاَشْرَافُ عِنْدَ سَمَاعِہٖ ۔قِیَامًا صُفُوْفًا اَوْجِثِیًّا عَلَی الرُّکَبِ
অর্থাৎ ‘‘সুন্দরতম কিতাবের পাতায় স্বর্ণাক্ষরেও যদি নবী মোস্তফার নাম অঙ্কন করা হয়, তবুও তাঁর বিশাল মর্যাদার তুলনায় তা অতি নগণ্য। অনুরূপ, শুধু তাঁর নাম শুনেও যদি উচ্চ পর্যায়ের লোকেরা সারিবদ্ধভাবে ক্বিয়াম করে (দাঁড়িয়ে যায়) অথবা আরোহী অবস্থায়ও নতজানু হয়ে যায়, তবুও তা তাঁর মহান মর্যাদার তুলনায় অতি নগণ্যই হবে।’’
সরসরীর কবিতার উক্ত চরণ দু’টি পাঠ করার সময়ে ইমাম তক্বিউদ্দীন সুবকী রহঃ ও উপস্থিত ওলামায়ে কেরাম নবী করীম (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে গেলেন। মজলিসে নবী-প্রেমের ঢেউ খেলে গেলো। সকলেই ভাবের আবেগে আপ্লুত হলেন। 
মীলাদ শরীফে ক্বিয়ামের বৈধতার ক্ষেত্রে ইমাম তক্বিউদ্দীন সুবকী রহঃ ও উপস্থিত ওলামায়ে কেরামের উক্ত ক্বিয়ামের অনুসরণ করাই যথেষ্ট। কেননা, এ ক্বিয়াম হলো নবী করীম (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর পবিত্র জন্মের শুভ সংবাদ উপলক্ষে তা’যীমী ক্বিয়াম। 
নবী করীম (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর উপস্থিতি (Presence) এখানে পূর্বশর্ত নয়- যদিও তিনি উপস্থিত হতে পারেন। 
[সূত্রঃ তাফসীরে রুহুল বয়ান ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৬।]

উম্মত ও ওলামা-ই কেরামের ইজমাঃ
প্রথা ও অনুষ্ঠান হিসাবে নতুন হলেও মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়ামের মূল ভিত্তি হচ্ছে ক্বোরআন ও সুন্নাহ্। কেননা রোযে আযলে আল্লাহ্ তা‘আলা মীলাদ শরীফের বর্ণনাকালে সম্মানিত নবীগণের মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন এবং নিজে ছিলেন মজলিসের প্রধান। 
অনুরূপ, সম্মানিত নবীগণ আপন আপন উম্মতের মাহফিলে মীলাদুন্নবীর আলোচনা করেছেন বলে ক্বোরআনেই সূরা-ই সাফ্ (২৮ পারায়) উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীকালে (৬০৪হিজরী) শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি নূতন হওয়ার কারণে বিদ্‘আতে হাসানাহ্ ও মুস্তাহাব-এর পর্যায়ভুক্ত হয়েছে বলে সকল আলিমের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণে মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম সকল ওলামা-ই কেরামের ইজমা’ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও সর্বত্র তা অনুসৃত। 
মুসলমানদের সর্বোৎকৃষ্ট শ্রেণীর আলিমদের ইজমা’র গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে ক্বোরআন মজিদে এরশাদ হয়েছেঃ
وَمَنْ یُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُ الْہُدٰی وَیَتَّبِعْ غَیْرَ سَبِیْلِ الْمُؤْمِنِیْنَ نُوَلِّہٖ مَا تَوَلّٰی وَنُصْلِہٖ جَہَنَّمَ وَسَآ ءَ تْ مَصِیْرًا [سورۃ نساء آیت ۱۱۵]
অর্থাৎ রাসূলের কাছে হিদায়ত প্রকাশিত হওয়ার পর যে কেউ তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করে এবং মুসলমানদের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে যে কেউ চলে, আমি তাকে ওই পথেই চালাবো, যে পথ সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। আর জাহান্নাম হচ্ছে নিকৃষ্টতম স্থান।’’ 
[সূরা নিসা: আয়াত-১১৫।]
উক্ত আয়াত অনুসারে, রাসূল-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতা এবং মুসলমানদের অনুসৃত ঐকমত্যের বিরোধিতা উভয়টির পরিণামই জাহান্নাম।
মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম সকল মুসলমানের অনুসৃত পথ। সুতরাং এর বিরোধিতার পরিণামও ভয়াবহ।
সকলের অনুসৃত পথকে ‘ইজমা-ই উম্মত’ বলা হয়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
لاَ تَجْتَمِعُ اُمَّتِیْ عَلَی الضَّلاَلَۃِ
অর্থাৎ ‘‘আমার সকল উম্মত গোমরাহীর কাজে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না।’’ 
সুতরাং মীলাদ ও ক্বিয়াম যে মন্দ কিছু নয়, তা সমগ্র উম্মত দ্বারা অনুসৃত ও গৃহীত হওয়াই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
‘নুরুল আনওয়ার’ গ্রন্থে ইজমা’ অধ্যায়ে উপরের আয়াতকে ইজমা’-ই উম্মতের একটি অকাট্য দলীল হিসেবে পেশ করা হয়েছে। 
একবার কোন বিষয়ে ইজমা’ হয়ে গেলে পরবর্তী যুগে কেউ-এর বিরোধিতা করলে বা ইখ্তিলাফ করলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না বলে উক্ত কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও বিরোধীদলের সংখ্যা পরবর্তীকালে বেশী হয়ে যায়।
পরবর্তীকালে মীলাদ ও ক্বিয়ামের বিরুদ্ধে মালেকী মাযহাবের শেষ যুগের একজন আলিম তাজুদ্দীন ফাকেহানী মালেকী বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সেটাকে তথাকথিত নিকৃষ্টতম বিদ্‘আত বলে উল্লেখ করেছেন; যেমন- কোথাও গান-বাজনার সংযোজন, মেয়েলোকদের বেপর্দাভাবে উপস্থিতি, উচ্চস্বরে তাদের না’ত পাঠ করা ও ক্বসীদা পাঠ করা ইত্যাদি। এগুলো তার যুগে হয়তো মীলাদ ও ক্বিয়ামের অনুষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করেছিলো কারণেই হয়তো তিনি ওই যুগের প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়ামকে নাজায়েয বলেছেন। (যেমনটি ‘মীলাদে সূয়ূত্বী’তে সেটার খণ্ডনসহকারে উল্লেখ করা হয়েছে।) মালেকী মাযহাবের অন্যান্য ওলামা-ই কেরামসহ চার মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম তাজুদ্দীন ফাকেহানীর উক্ত ফাত্ওয়ার খণ্ডন করে মীলাদ-ক্বিয়ামের পক্ষে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন।
ইবনে হাজর আসক্বালানী ও জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী আলায়হিমার রাহমাহ্ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সুতরাং উল্লিখিত কারণগুলোর ভিত্তিতে তাজুদ্দীন ফাকেহানীর বিরোধিতা ইজমা’র সিদ্ধান্তকে বাতিল করতে পারে না।
ক্বোরআন ও হাদীসে মীলাদ এবং ক্বিয়ামের মূল সূত্র বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তীকালে যুগের চাহিদা অনুযায়ী স্বতন্ত্রভাবে মিলাদ ও ক্বিয়ামের পৃথক পৃথক মাহফিলের প্রচলন শুরু হয়েছে।
যেমন প্রচলন হয়েছে জামা‘আতের সাথে বিশ ‘রাক্‘আত তারাবীহ্, ক্বোরআন একত্রীকরণ, ক্বোরআন সংকলন, জুমু‘আহর প্রথম আযান, আরবী ব্যাকরণ, ক্বোরআনের নোক্বতাহ্ ও হরকত সংযোজন, রুকু’, পারা মনযিল ইত্যাদির সংযোজন, যা নবী করীমের যুগে ছিলো না। 
নবী করীম (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর যুগের পরে সংযোজিত হওয়ার কারণে এগুলো বিদ্‘আত-ই হাসানার অন্তর্ভুক্ত হয়ে কোনটি ওয়াজিব, কোনটি সুন্নাত, কোনটি মুস্তাহাব হয়েছে।
০১/ তারাবীহ্ নামায জামা‘আতের সাথে প্রচলন হয়েছে হযরত ওমর ফারূক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু-এর আমলে। এটা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্।
০২/ জুমু‘আর প্রথম আযান প্রচলন করেছেন হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। এটি সুন্নাত।
০৩/ আরবী ব্যাকরণ প্রচলন করেছেন হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এবং এটি শিক্ষা করা ওয়াজিব।
০৪/ ক্বোরআনের নোক্বতাহ্ ও হরকত সংযোজন করেছেন হাজ্জাজ ইবনে ইয়ূসুফ, উমাইয়া শাসক ৮৬ হিজরীতে। এটা মুস্তাহাব।
সব মিলিয়ে এগুলোকে বিদ‘আতে হাসানাহ্ (উত্তম বিদ্‘আত) বলা হয়। তাই এগুলো পরিত্যাজ্য হয় কীভাবে?
মীলাদ এবং ক্বিয়ামের প্রচলনও অনুরূপ মুস্তাহাব পর্যায়ের বিদ্‘আত। তা ৬০৪ হিজরীতে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন-
اِنَّ الْبِدْعَۃَ الْحَسَنَۃَ مُتَّفَقٌ عَلٰی نُدْبِہَا وَعَملُ الْمَوْلِدِ وَاِجْتِمَاعُ النَّاسِ لَہٗ کَذَالِکَ اَیْ بِدْعَۃٌ حَسَنَۃٌ ۔ (تَفْسِیْرِ رُوْحُ الْبَیَانِ جلد ۹ صفحہ ۵۷)
অর্থাৎ বিদ‘আতে হাসানার কাজ মোস্তাহাব হওয়ার উপর সকল বিজ্ঞ আলিমদের ঐকমত্য (ইজমা) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মীলাদ শরীফের আমল ও সেটার উদ্দেশ্যে লোকদের মাহফিল করা অনুরূপ মুস্তাহাব।
[সূত্রঃ তাফসীর রুহুল বয়ান, ৯ম খণ্ড, পৃ., ৫৬।]


আরও সংবাদ   বিষয়:  মীলাদুন্নবী   ঈদে মিলাদুন্নবী   জুলুছ   মাহমুদ হাছান   মাহফিল   মাজার  




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

প্রকাশক ও সম্পাদক :---
"মা নীড়" ১৩২/৩ আহমদবাগ, সবুজবাগ, ঢাকা-১২১৪
ফোন : +৮৮-০২-৭২৭৫১০৭, মোবাইল : ০১৭৩৯-৩৬০৮৬৩, ই-মেইল : [email protected]