শিরোনাম
হযরত মাওলা আলী رضي الله عنه’র পবিত্র শাহাদাৎ বার্ষিকী স্মরণে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত       রমজানের রোযার ফজিলত ও করণীয়       লাইলাতুল বরাতের প্রামাণ্যতা ও তাৎপর্য       শা’বান মাস ও শবে বরাতের তাৎপর্য       মি’রাজুনন্নবী : আশিক-মাশুকের মিলনমেলা       বাবে সগীর কবরস্থান,দামেস্ক,সিরিয়া       ক্বওমী মাদরাসাকে শর্তহীন সনদ দেওয়া অযৌক্তিক      
আজ রবিবার, ৮ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৩ জুলাই ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
রমজানের রোযার ফজিলত ও করণীয়
কাজী মুহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম
প্রকাশ : ২০১৭-০৫-২৭ সময় : ০০:৫২, সর্বশেষ আপডেট : ২০১৭-০৫-২৭ সময় : ০১:০২
রমজানের রোযার ফজিলত ও করণীয়

‘সাওম’ আরবী শব্দ,এর অর্থ-বিরত থাকা। ‘রোযা’ ফার্সি শব্দ, এর অর্থ- উপবাস থাকা। সুবহি সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার,স্ত্রী সহবাস হতে নিয়ত সহকারে বিরত থাকাকে ফিক্বহে ইসলামীর পরিভাষায় ‘সাওম’ বা ‘রোযা’ বলা হয়। রোযা ইসলামের তৃতীয় রুকন। মহান আল্লাহ্ তায়ালা ঘোষণার মাধ্যমে হিযরতের দেড় বছর পর অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরীতে শাবান মাসের ১০ তারিখে উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর পবিত্র রমজান মাসের রোযা ফরজ করেছেন। সকল সুস্থ, প্রাপ্ত বয়স্ক ও জ্ঞানবান মুসলিম সমাজের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি,পারস্পরিক সহনশীলতা, সামাজিক শুদ্ধতা অর্জনে এবং পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে আত্মসংযম ও তাক্ওয়া হাসিলে রোযার বিশাল গুরুত্ব ও অবদান রয়েছে। হযরত আদম আলাইহি’স সালাম থেকে এ সাওমের বিধান ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। [দূররে মুখতার,খাযাইনুল ইরফান ও খাযিন ]

রমজানের রোযার ফজিলত

রোযার ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন - হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রমজানের রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপরও ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা খোদাভীরু তথা তাক্ওয়াবান হতে পারো। [আল কুরআন সূরাহ বাক্বারাহ, আয়াত -১৮৩ ]
অফুরন্ত রহমত, বরকত ও ফজিলতে পরিপূর্ণ এই রমজান মাস। এ মাসের রোযা রাখার ফজিলত বর্ণনাতীত। মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কুরআন মজিদে ইরশাদ করেন, “তোমাদের মধ্যে যেই রমজান মাসে উপস্থিত থাকে, অর্থাৎ রমজান মাস পায়, তারই রোযা পালন করা আবশ্যক”। কারণ এতে অশেষ কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নিহিত রয়েছে। (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত -১৮৬)।হযরত সালমান ফারসী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন শাবান মাসের শেষ দিনে সাহাবাই কেরামের উদ্দেশ্য করে বলেন, হে লোকেরা! তোমাদের উপর একটি মহান মুরারক মাস ছায়া ফেলেছে। এ মাসে হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ একটি রাত আছে। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন ভাল কাজ দ্বারা আল্লাহ্র সান্নিধ্য কামনা করে, সে যেন অন্য মাসে কোন ফরয কাজ করার ন্যায় আমল করল। আর এ মাসে কোন ব্যক্তি যদি একটি ফরজ কাজ করে, সে যেন অন্য সময়ে ৭০টি ফরজ আদায়ের নেকী লাভ করার সমান কাজ করল। এটি হলো সংযমের মাস আর সংযমের ফল হলো জান্নাত। এটি সাম্যের মাস, এমন মাসে যাতে রিযিক বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। (বায়হাকী ও মিশকাত)

বর্ণিত হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, এটি এমন মাস যার প্রথমাংশ রহমত বা দয়া, মধ্যম অংশ মাগফিরাত তথা ক্ষমা এবং শেষাংশ নাযাত বা দোযখ হতে মুক্তি দানের জন্য নির্ধারিত। এ মাস পাপ পংকিলতা পরিহার করার এবং সৎকর্মে নিজেকে নিয়োগ করার মাস। (বায়হাকী ও মিশকাত)

হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে রমজানের রোযা রাখে, তার অতীতের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে রমজানে ইবাদত করে, তার অতীতের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

শয়তানী ধোঁকা ও কুমন্ত্রণা হতে রমজান শরীফ মানুষকে রক্ষা করে এবং একাগ্রচিত্তে মহান রবের ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। যেমন- হাদীস পাকে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যখন রমজান মাস আগমন করে, আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। অন্য বর্ণনা মতে, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। অন্য এক বর্ণনা মতে রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। (বুখারী ও মুসলিম)

পার্থিব দোষ-ত্রূটি, পাপ হতে রমজান শরীফ ঈমানদারগণকে পবিত্র করে। মহান রবের দয়া ও বরকত প্রাপ্তির যোগ্য করে তোলে। হাদীস শরীফে এরশাদ হচ্ছে, রমজানের প্রতিরাতে সকাল হওয়া অবধি একজন আহবানকারী ফিরিশতা এ আহবান করেন যে, হে কল্যাণকামীগণ! কামনার ইতি টান এবং তুষ্ট হয়ে যাও। হে মন্দকারী! পাপ হতে বিরত হও এবং উপদেশ গ্রহণ কর। এমন কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? তাকে ক্ষমা করা হবে। এমন কোন তাওবাকারী আছে কি? তার তাওবা কবুল করা হবে। এমন কোন সাহায্যপ্রার্থী আছে কি? তাকে তার প্রার্থিত বিষয় দেওয়া হবে। আর ঈদুল ফিতরের দিন ত্রিশ দিনের সমপরিমাণ পাপীদের ক্ষমা করে দেন। (তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)

রমজানুল মোবারকের আগমন ও এ মাসকে স্বাগত জানানোর লক্ষ্যে মহান আল্লাহ তায়ালা সারা বছর ধরে জান্নাতকে সজ্জিত করেন। হাদীস শরীফে এরশাদ হচ্ছে; হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, নিশ্চয় জান্নাত বছরের শুরু হতে আগামী বছর আসা পর্যন্ত সজ্জিত করা হয়, রমজানুল মোবারককে উদ্দেশ্য করে। তিনি আরো বলেন, রমজান শরীফের প্রথম দিনে আরশের তলদেশে জান্নাতের বৃক্ষের পাতায় বড় বড় চোখ বিশিষ্ট হুরগণের পাশ দিয়ে হাওয়া প্রবাহিত হয়। অতঃপর তারা বলে, হে আমাদের প্রভু! তোমার
বান্দাগণ হতে এমন বান্দাদের আমাদের জোড়া বানাও যারা আমাদের দেখে এবং আমরা তাদের দেখে পরস্পরের চক্ষু ঠান্ডা হবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, বেহেশতে আটটি দরজা রয়েছে,তম্মধ্যে একটির নাম হলো “রাইয়্যান” যা দ্বারা একমাত্র রোযাদারগণ বেহেশতে প্রবেশ করবে। (বুখারী মুসলিম ও বায়হাকী)

রমজান শরীফের রোযার এতই গুরুত্ব যে, এ মাসের একটি রোযা যুগ যুগ ধরে রোযা রাখার চেয়েও উত্তম। সারা বছর রোযা রাখলেও এ মাসের একটি রোযার সমান হবেনা। হাদীস শরীফে এরশাদ হচ্ছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, কোন শরয়ী অনুমোদন ছাড়া বা রোগ ব্যতীত কোন ব্যক্তি যদি পবিত্র রমজান মাসের একটি রোযাও ভেঙ্গে ফেলে, এর কাজা হবেনা যদিও সে যুগ যুগ ধরে রোযা রাখে। (মিশকাত)

অন্যত্র মহান আল্লাহ তায়ালা হাদিসে কুদসীতে এরশাদ করেন, রোযা আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। (বুখারী ও মুসলিম)

রমজানে করণীয়

* নুযূলুল কুরআন তথা কুরআন মজীদ অবতীর্ণের মাস হিসেবে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা। কারণ হাদীসে আছে, ‘কুরআন ও রোযা’ কিয়ামত দিবসে রোযাদারের জন্য সুপারিশ করবে (আল কুরআন ও বায়হাকী)।

* একটি কাজ ফরজ আদায়ে যেহেতু ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব, তাই যত ফরজ ইবাদত রয়েছে তা সময়মত আদায় করা এবং একটি নফলে ফরজের
সমান সাওয়াব, তাই বেশি বেশি নফল ইবাদত করা (বায়হাকী)।

*প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ-খবর নেওয়া, যেহেতু হাদীসে আছে এটি সহমর্মিতার মাস। (মিশকাত)

*রোযা অবস্থায় অশ্লীল কাজ ও অশ্লীল কথাবার্তা, বেহায়াপনা, মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, গীবত, হাসদ, হিংসা-বিদ্বেষ, চুগলী, গালি-গালাজ, বেহুদা কথা-বার্তা কারো অন্তরে কষ্ট দেওয়া, জুলুম করা, নাচ-গান দেখা ও শোনা, টেলিভিশনে অশ্লীল অনুষ্ঠান দেখা, ঝগড়া-বিবাদ করা, পরের হক ধ্বংস করা, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ তথা রিপুসমূহ ইত্যাদি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কাজ থেকে নিজেকে পরহেজ বা বাচিয়ে রাখা। যেহেতু সমস্ত গর্হিত কাজ দ্বারা রোযার সওয়াব অনেক কমে যায়। (তাফসীরে রুহুল বয়ান ও বাহারে শরীয়ত)

*ভোর রাতে সাহরী খাওয়া। হাদীসে আছে, তোমরা সাহরী খাও এতে বরকত রয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)

* ইফতারের সময় ইফতার সামনে নিয়ে দোয়া করা। হাদীসে আছে, ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। (আবু দাউদ)

*খেজুর দ্বারা ইফতার করা। সম্ভব না হলে পানি দ্বারা ইফতার করা। ইফতারে দেরী না করা। কেননা এটি ইহুদি-নাসারাদের অভ্যাস এবং কোন রোযাদারকে ইফতার করানো। যে ইফতার করাবে সে রোযাদারের সমান সওয়াব পাবে। (তিরমিযী)

*শবে ক্বদরের রাত্রিতে জেগে থেকে ইবাদত করা। হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে সওয়াবের আশায় শবে ক্বদরে ইবাদত বন্দেগী করে, তার অতীত জীবনের সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)
 
*যাকাত প্রদান ও বেশি বেশি দান সদকাহ্ করা। কাজ থেকে নিজেকে পরহেজ বা বাচিয়ে রাখা। যেহেতু সমস্ত গর্হিত কাজ দ্বারা রোযার সওয়াব অনেক কমে যায়। (তাফসীরে রুহুল বয়ান ও বাহারে শরীয়ত)

*ভোর রাতে সাহরী খাওয়া। হাদীসে আছে, তোমরা সাহরী খাও এতে বরকত রয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)

* ইফতারের সময় ইফতার সামনে নিয়ে দোয়া করা। হাদীসে আছে, ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। (আবু দাউদ)

*খেজুর দ্বারা ইফতার করা। সম্ভব না হলে পানি দ্বারা ইফতার করা। ইফতারে দেরী না করা। কেননা এটি ইহুদি-নাসারাদের অভ্যাস এবং কোন রোযাদারকে ইফতার করানো। যে ইফতার করাবে সে রোযাদারের সমান সওয়াব পাবে। (তিরমিযী)

*শবে ক্বদরের রাত্রিতে জেগে থেকে ইবাদত করা। হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে সওয়াবের আশায় শবে ক্বদরে ইবাদত বন্দেগী করে, তার অতীত জীবনের সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)
 
*যাকাত প্রদান ও বেশি বেশি দান সদকাহ্ করা। যাতে গরীব-অসহায়গণ স্বাচ্ছন্দে রোযা রাখতে পারে। (দূররে মুখতার)

*রমজানের শেষ দশ দিন ই’তিকাফ করা। হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি ই’তিকাফ করবে সে যেন দুটি হজ্জ্ব ও দু’টি ওমরার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে কখনো ই’তিকাফ ত্যাগ করেননি। (বুখারী ও মুসলিম)

*ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকায়ে ফিতর তথা ফিতরা আদায় করা। (আল মুখতাসারুল কুদরী)

উপরোক্ত কুরআন-হাদীসের আলোকে বলা যায়, পবিত্র রমজান মাসের রোযার ফজিলত অত্যধিক, যা ধারণা বা অনুমানযোগ্যও নয়। আল্লাহ পাক আমাদেরকে এ মহান ফজিলত ওয়ালা মাসের বারাকাত ও ফয়ুজাত দানে ধন্য করুণ। আমিন!
 
 




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
প্রকাশক ও সম্পাদক :---
"মা নীড়" ১৩২/৩ আহমদবাগ, সবুজবাগ, ঢাকা-১২১৪
ফোন : +৮৮-০২-৭২৭৫১০৭, মোবাইল : ০১৭১১১৭৭৭৭৪, ই-মেইল : sunnibarta@gmail.com