শিরোনাম
ইসলামে কাব্য, কবিতা, কাব্য চর্চা : না'তে রাসূল "মীলাদ শরিফ" কবিতার নাম       আল্লাহর যেকোন অনুগ্রহ ও নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বরুপ ভোজ অনুষ্ঠান ও ইসলাম       কুরআন-সুন্নাহের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ এঁর স্মরনে স্মরনানুষ্ঠান/উদযাপন/পালন       ১২ই রবিউল আউয়াল, নাকি ৯ই রবিউল আউয়াল অথবা ২রা রবিউল আউয়াল       না'ত কবিতা মীলাদ শরীফ দাঁড়িয়ে পাঠ করা বা মীলাদে ক্বিয়াম করা আদাব        পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন       ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺনিয়ে ইমাম মুজতাহিদগনের অভিমত      
আজ রবিবার, ৩ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
কুরআন-সুন্নাহের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ এঁর স্মরনে স্মরনানুষ্ঠান/উদযাপন/পালন
মাহমুদ হাছান
প্রকাশ : ২০১৭-১২-০২ সময় : ১১:৫২,
কুরআন-সুন্নাহের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ এঁর স্মরনে স্মরনানুষ্ঠান/উদযাপন/পালন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার আগমনের দিন কেবল মুসলমান নয়, সৃষ্টিজগতের সকলের জন্যে আনন্দ ও রহমতের দিন। 

আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন- 

وما أرسلناك إلا رحمة للعالمين “
আমি আপনাকে জগতসমূহের রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি।”
[আল-কুরআন, সূরা: আম্বিয়া, আয়াত নং-১০৭।]
সারা বিশ্বের মুসলিমগণ অত্যন্তভক্তি ও মর্যাদার সাথে রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করে থাকেন তথা স্মরন করে থাকেন। 
কিন্তু এক দল আলেম এটিকে অবৈধ ও বিদয়াতে সাইয়্যিাহ (মন্দ বিদআত) বলে অপপ্রচার করছে। অথচ এটি একটি শরিয়ত সম্মত পুণ্যময় আমল, যা কুরআন, সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। 

অত্র প্রবন্ধে এটি শরিয়ত সম্মত হবার বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি।

১. ঈদে মিলাদুন্নবি পরিচিতি:

ক. শাব্দিক পরিচয়:
‘ঈদে মিলাদুন্নবি’ শব্দটি যৌগিক শব্দ। যা তিনটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। 
যেমন- 
এক. ঈদ 
দুই. মিলাদ 
তিন. নবি। 
প্রথমত: ঈদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ উৎসব, আনন্দ, খুশি। 
বিশ্ববিখ্যাত অভিধান প্রণেতা ইবনু মনযুর বলেন-

العيد كل يوم فيه جمع ‘
সমবেত হবার প্রত্যেকদিনকে ঈদ’ বলা হয়। 
[সূত্রঃ ইবনু মনযুর, লিসানুল আরাব, দারু সাদির, বৈরুত, ১ম সংস্করণ, খ. ৩য়, পৃ. ৩১৫।]

মুফতি আমীমূল ইহসান আলাইহির রাহমাহ বলেন-

العيد كل يوم فيه جمع او تذكار لذي فضل
“কোন মর্যদাবান ব্যক্তিকে স্মরণের দিন বা সমবেত হওয়ার দিনকে ঈদের দিন বলা হয়।”
[সূত্রঃ মুফতি আমীমূল ইহসান, কাওয়ায়িদুল ফিকহ, আশরাফি বুক ডিপু, ভারত, ১ম সংস্করণ, ১৩৮১ হিজরী, পৃ., ৩৯৫।] 

দ্বিতীয়ত: মিলাদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ: জন্মকাল, জন্মদিন। এ অর্থে ‘মাওলিদ’ শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় অত্যাধিক। 

তৃতীয়ত: নবি; এখানে নবি বলতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। 
সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবি’ অর্থ নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র আগমন উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন।

খ. ‘ঈদে মিলাদুন্নবি’র পরিচয়:
এ ধরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র আগমন উপলক্ষে আনন্দিত হওয়া এবং এ অদ্বিতীয় নিয়ামত পাবার কারণে সৎকাজ ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপন করাকে ‘ঈদে মিলাদুন্নবি’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলা হয়।

ঈদে মিলাদুন্নবি উদযাপনঃ
ঈদে মিলাদুন্নবি উদযাপন করা বৈধ ও উত্তম আমল, যা পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরিফ দ্বারা প্রমাণিত। 

এ বিষয়ে কুরআন-হাদিসের দলিল-প্রমাণ সংক্ষিপ্তকারে তুলে ধরা হল।

ক. কুরআন মাজিদের আলোকেঃ
ঈদে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করা পবিত্র কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। 
মহান আল্লাহ কুরআন মজিদে নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন-

فاذكروني اذكركم واشكروا لي ولاتكفرون
“সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব। তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও, অকৃতজ্ঞ হয়ো না।”
[সূত্রঃ আলকুরআন, সূরা-বাকারা, আয়াত নং ১৫২।] 
এ থেকে বোঝা গেল যে, আল্লাহর নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপন করা প্রত্যেক মানুষের ওপর অপরিহার্য। 

শোকরিয়া জ্ঞাপনের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে যেমন আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের বর্ণনা দেওয়া, নিয়ামতের ওপর আনন্দ উদযান করা, ঈদ উদযান করা ইত্যাদি। 

ঈদ উদযাপন করাঃ
আল্লাহর নিয়ামত পাবার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমেও নিয়ামতের শোকরিয়া করা যায়। 
যেমন- 
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন- 

ربنا أنزل علينا مائدة من السماء تكون لنا عيدا لاولنا واخرنا واية منك
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করুন; এটি আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য হবে ঈদ স্বরূপ এবং আপনার নিকটি হতে নিদর্শন হবে।”
[আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ১১৪।]
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তায়ালার নিকট ফরিয়াদ করেছিলেন যেন তিনি তাঁদের জন্য আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন যে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ হলে তাঁরা সে দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করবেন। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁদের ওপর সেই নিয়ামত রবিবারে অবতীর্ণ করেছিলেন বিধায় তাঁরা আজও রবিববারকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন।

কুরআন মাজিদের এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, নিয়ামত পাবার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার স্বীকৃতি রয়েছে; কারণ তিনি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ঈদ উদযাপনের স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর উক্তি পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন এবং কোন প্রকার নিষেধ করেননি। এটি অবৈধ হলে তিনি অবশ্যই তা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করতেন।

ঈসা আলাইহিস সালামের উম্মতদের ওপর খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা রবিবারে অবতীর্ণ হবার কারণে সেদিনকে যদি ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করা যায়, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমনের দিনকে কেন ঈদের দিন হিসেবে মানা যাবে না? অথচ তিনিই হলেন সবচেয়ে বড় নিয়ামত। 
সুতরাং তুলনামুলক ছোট নিয়ামতের শোকরিয়া স্বরূপ সেই নিয়ামত পাবার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করা বৈধ হলে নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত পাবার দিনকে ঈদের দিন হিসেবে মানা ও উদযাপন করা বৈধ।

খুশি উদযাপন করাঃ
আল্লাহ তায়ালার নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনের একটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হল নিয়ামতের ওপর খুশি উদযাপন করা। 
তাই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-

قل بفضل الله وبرحمته فبذلك فليفرحوا هو خير مما يجمعون 
“(হে রাসুল) আপনি বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ(ফদ্বল) ও দয়াকে (রহমত) স্মরণ করে সেটার ওপর তারা যেন খুশি প্রকাশ করে। তা তাদের সঞ্চয়কৃত সমস্ত ধন-সম্পদ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর।”
[আল কুরআন, সূরা ইউনূস, আয়াত ৫৮।]
এ আয়াতে মহান রাব্বুল আলামীন খুশি উদযাপনের দুটি উপকরণ সাব্যস্ত করেছেন। একটি হল “ফদ্বল” ( فضل) আর অপরটি হল “রহমত” (رحمة)। 
এতদুভয়ের মর্ম কী- এর ব্যাখ্যায় নিন্মোক্ত তাফসীর সমূহে অনুরুপ তাফসীর করা হয়েছেঃ
প্রখ্যাত তাফসির বিশারদ আল্লামা মাহমূদ আলুসী (আল্লামা আলূসী, রুহুল মায়ানী, দারু ইহইয়ায়িত্ তুরাসিল আরাবী, লেবানন, বৈরুত, খ. ১০ম, পৃ.১৪১)

ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ূতী, (ইমাম সূয়তী, আদ্ দুররুল মনছুর। দারুল মারিফা, লেবানন, বৈরুত, খ.৪র্থ, পৃ.৩৩০)

ইমাম আবু হাইয়ান আনদুলসী (ইমাম আবু হাইয়ান, আল বাহরুল মুহীত, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৪২০ হি., খ.৬, পৃ.৭৫) আলাইহিমুর রাহমান।

উপরোক্ত তাফসীরবিদেরা স্ব-স্ব তাফসীর গ্রন্থের তাফসিরকারকদের শিরোমণি হযরত ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এখানে “ফদ্বল” দ্বারা জ্ঞান এবং “রহমত” দ্বারা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্দেশ্য। 

আল্লামা ইবনু জাওযী (রহমাতুল্লাহি 'আলাইহি)বলেন- 

ان فضل الله العلم ورحمته محمد صلى الله عليه وسلم رواه الضحاك
“নিশ্চয় আল্লাহর “ফদ্বল” হল জ্ঞান আর “রহমত” হল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; যা ইমাম দাহ্হাক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন। 
[সূত্রঃ ইবনু জাওযী, যাদুল মাসীর, আল-মাকতাবুল ইসলামী, বৈরুত, ১৪০৪ হিজরী, খ. ৪র্থ, পৃ. ৪০।]

আল্লামা তিবরিসী উল্লিখিত আয়াতের অর্থ করতে গিয়ে বলেন- 

فافرحوا بفضل الله عليكم ورحمته لكم بإنزال هذا القرآن وإرسال محمد إليكم فانكم تحصلون بهما نعيما دائما مقيما هو خير لكم من هذه الدنيا الفانية
“তোমাদের প্রতি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করে এবং কুরআন অবতীর্ণ করে আল্লাহ তায়ালা তোমদের ওপর যে দয়া ও করুণা করেছেন, তাতে তোমরা খুশি উদযাপন কর। কেননা উভয়ের (ফদল ও রহমত) মাধ্যমে নিশ্চয় তোমরা চিরস্থায়ী নিয়ামত অর্জন করবে, যা এ নশ্বর পৃথিবী থেকে তোমাদের জন্য অধিকতর শ্রেয়।”
[সূত্রঃ আল্লামা তিবরিসী, মাজমাউল বয়ান, ইনশরাতে নাসির খসরু, তেহরান, ইরান, তারিখ বিহীন, খ. ৫ম, পৃ. ১৭৭।]

ইমাম বাক্বির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রখ্যাত মুফাসসির হযরত ক্বাতাদাহ্, হযরত মুজাহিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেন যে “ফদ্বলুল্লাহ”(فضل الله) দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। 
[সূত্রঃ প্রাগুক্ত খ.৫ম, পৃ. ১৭৮।]
উল্লিখিত আয়াতে “রহমত” দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'কে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেছেন-

وما أرسلناك إلا رحمة للعالمين
“আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।”
[সূত্রঃ আল-কুরআন, সূরা আম্বীয়া, আয়াত ১০৭।] 

প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা মাহমূদ আলূসী আলাইহির রাহমাহ প্রমুখের মতে “রহমত” হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি নাম। এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন বিশ্ববাসীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। এতে কারো দ্বিমত নেই। 
তাই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- 

ولقد من الله على المؤمنين إذ بعث فيهم رسولا من أنفسهم
“আল্লাহ মুমিনদের ওপর অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাঁদের নিজেদের মধ্য থেকে তাঁদের নিকটি রাসূল প্রেরণ করেছেন।”
[সূত্রঃ প্রাগুক্ত, সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৬৪।]
সুতরাং প্রতিয়মান হয় যে, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্ববাসীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ ও নিয়ামত। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা এ অনুগ্রহ তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'কে পাবার ওপর খুশি উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'কে পাবার দিন হল ‘মিলাদুন্নবি’ এবং ‘মিলাদুন্নবি’ কে কেন্দ্র করে খুশি উদযাপন করাই হল ‘ঈদে মিলাদুন্নবি’ যা পালন করার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহই দিয়েছেন।

দেওবন্দীদের নির্ভরযোগ্য আলেম আশরাফ আলী থানভী বলেন যে, “উল্লিখিত আয়াতে “রহমত” ও “ফদল” দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামাকে বুঝানো হয়েছে, যাঁর জন্মের ওপর আল্লাহ তায়ালা খুশি উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ তিনি সকল নিয়ামতের মূল। তাই তাঁর আগমনে যতই খুশি উদযাপন করা হোক না কেন, তা কমই হবে।”
[সূত্রঃ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মিলাদুন্নবী, জীলি কুতুবখানা, লাহুর, তারিখবিহীন, পৃ. ১৫৪, ১২০, ১২১।]
এ ছাড়াও উপরিউক্ত আয়াতের ‘রহমত’ শব্দ দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'কে খাস বা নির্দিষ্ট অর্থে বুঝানো না হলেও ‘আম’ বা ব্যাপক অর্থে তাঁকে বুঝাতে কারো দ্বিমত থাকতে পারে না; কারণ তিনি সৃষ্টি জগতের প্রতি আল্লাহর বড় রহমত।

আল্লাহর অন্যান্য নিয়ামতের মত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা যেহেতু একটি নিয়মত, সেহেতু তাঁর আগমনের ওপর খুশি উদযাপন করা আল্লাহর নির্দেশ পালন মাত্র। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর জন্ম উপলক্ষে খুশি উদযাপন করার নামই হল ‘ঈদে মিলাদুন্নবি’।

অতএব কুরআনের আয়াত থেকে প্রমাণিত হল যে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর জন্ম উপলক্ষে খুশি উদযাপন করা আল্লাহর নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। 

খুশি উদযাপনের ক্ষেত্রে সকল বৈধ পন্থা গ্রহণ করা শরিয়ত সম্মত। তাই মুসলিমগণ একত্র হয়ে মানুষের প্রতি আল্লাহর বড় কৃপার কথা তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর আগমনের কথা স্মরণ করে, রাসুলের জীবন-বৃত্তান্ত বর্ণনা করে, ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে খানা-পিনার আয়োজন করে এবং দান-সদকা ইত্যাদির ব্যবস্থা করে। মোট কথা খুশি উদযাপনের বহিঃপ্রকাশ শরিয়ত সম্মত পন্থায় হলে তাতে কোন অসুবিধা নেই।

মহান আল্লাহ কর্তৃক মিলাদুন্নবি উদযাপনঃ
পূর্বেই বলা হয়েছে যে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন বলতে নবির জন্মকে স্মরণ করা এবং তাঁর জীবন-বৃত্তান্ত বর্ণনা করা।

মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে পঁচিশজন নবি রাসূলের মধ্যে হযরত আদম, হযরত মূসা, হযরত ইহইয়া, হযরত ঈসা ও হযরত মুহাম্মদ আলাইহিমুস সালামের জন্ম-বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন। 
যেমন হযরত ইহইয়া আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-

وسلام عليه يوم ولد
“তাঁর প্রতি সালাম, যেদিন তিনি (ইহইয়া আ.) জন্মলাভ করেন ।”
[সূত্রঃ আল-কুরআন, সূরা মরিয়ম, আযাত ১৫।]
এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইহইয়া আলাইহিস সালামের জন্মকালের কথা উল্লেখ করেছেন। আর এটার নাম ‘মিলাদুন্নবি’ বা নবীর জন্মকাল। 
তিনি পবিত্র কুরআনে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ইরশাদ করেন-

لقد جاءكم رسول من أنفسكم عزيز عليه ما عنتم حريص عليكم بالمؤمنين رؤف رحيم
“অবশ্যই তোমাদের (আরবগণ) মধ্য থেকেই (বংশ থেকে) তোমাদের নিকট এসেছেন এক রাসূল। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।।’
[সূত্রঃ প্রাগুক্ত, সুরা তাবাহ, আয়াত ১২৮।]
এ আয়াতে মহান আল্লাহ আরবদেরকে স্মরণ করে দিলেন যে, তাঁদের নিকট তাঁদের বংশ থেকেই এক মহান রাসূল এসেছেন। এখানে আসার অর্থ হল জন্ম গ্রহণ করা। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর জন্ম তথা ‘মিলাদুন্নবি’র কথা উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি অসংখ্য আয়াতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামরে আগমনের কথা উল্লেখ করেছেন। 
এভাবে তিনি তাঁর প্রেরিত নবি-রাসূলের জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন। এটাই হল ‘মিলাদুন্নবি’ উদযাপন। 

খ. হাদিছ শরিফের আলোকেঃ
ঈদে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করা হাদিছ শরিফ দ্বারাও প্রমাণিত হয়। 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও শোকরিয়া স্বরূপ এ ঈদে মিলাদুন্নবি উদযাপন করেছেন, ছাগল জবাই করে এবং রোযা রেখে।

এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিছ নিম্নে উল্লেখ করা হল। 

১. প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু বলেন-

قدم النبي المدينة فرأى اليهود تصوم يوم عاشوراء فقال: ما هذا؟ قالوا: هذا يوم صالح هذا يوم نجى الله بني اسرائيل من عدوهم فصيامه موسى قال فأنا أحق بموسى منكم فصيامه وأمر بصيامه 
“নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা শরিফ আগমন করলেন এবং সেখানে ইয়াহুদিদেরকে আশুরার দিনে রোযা রাখতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন- এটা কিসের রোযা? তারা বলল, এটা উত্তম দিন আর এ দিনেই আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে তাঁদের শত্রুদের থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তাই হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এ দিনে রোযা রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের চেয়ে মূসা আলাইহিস সালামের আমিই অধিকতর হক্বদার। অতঃপর তিনি স্বয়ং রোযা রাখলেন এবং তাঁর উম্মতদের এ রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন।’
[সূত্রঃ ইমাম বুখারী, আল জামেউল সহীহ, দারু ইবনে কাসীর, আল-ইমামা, বৈরুত, ১৪০৭ হিজরী, হাদিস ১৯০০, খ. ২য় , পৃ., ৭০৪; ইমাম ইবনু 
মাজাহ, সুনান, দারূর ফিকর, বৈরুত, হাদিছ ১৭৭৪, খ. ১ম, পৃ. ৫৫২; ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, আল মুসনাদ, আলামূল কুতুব, বৈরুত, 
হাদিছ ২৬৪৪, খ.১ম, পৃ.২৯১; ইমাম আবু ইয়ালা, আল মুসনাদ, দারুল মামূন লিত্-তুরাস, দামেস্ক, ১৪০৪ হিজরী, খ. ৪র্থ, পৃ.৪৪১।]

২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অন্য হাদিছে বর্ণনা করেন-

هذا اليوم الذي أظفر الله فيه موسى وبني اسرائيل على فرعون ونحن نصومه تعظيما له فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : نحن اولى بموسى منكم ثم امر بصومه
“এ দিনেই আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং বনি ইসরাঈলদেরকে ফিরয়াউনের ওপর বিজয় দান করেছেন। আমরা এ দিনের সম্মানার্থে রোযা রাখছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-“আমরা তোমাদের চেয়ে মূসা আলাইহিস সালাম’র অধিকতর হক্বদার।” তারপর তিনি (মুমিনদেরকে)এ রোযা রাখার নির্দেশ দেন।”
[সূত্রঃ ইমাম বুখারী, প্রাগুক্ত, হাদিছ ৩৭২৭, খ. ৩য়, পৃ. ১৪৩৪; ইমাম মুসলিম, প্রাগুক্ত, হাদিছ ২৭১২, খ. ৩য় পৃ. ১৪৯; ইমাম আবু দাউদ, সুনান, দারুল ফিকর, বৈরুত, হাদিছ ২৪৪৪, খ. ১ম, পৃ. ৭৪২; ইমাম ইবনু খুযাইমাহ, সহীহ , আলমাকতাবুল ইসলামী, বৈরুত, হাদিছ ২০৪৮, খ. ৩য়, পৃ. ২৮৬।]

উপরিউক্ত হাদিছদ্বয় থেকে যা বোঝা যায় - 

এক. 
আশুরার দিনে আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং বনি ইসরাঈলকে ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছেন। 
এ কারণে আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপনার্থে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম রোযা রেখেছেন। সুতরাং আমরা সৃষ্টির সবচেয়ে বড় নিয়ামত রাসূলুল্লাহকে পাবার দিনকে স্মরণ করে আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপন করে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করি।

দুই. 
ইয়াহুদিরা নিয়ামত পাবার দিনকে স্মরণ করে প্রতি বছর একই দিনে রোযা রাখতেন। এ কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেনেও বলেননি যে, তোমরা তো অনেক বছর পূর্বে নিয়ামত পেয়েছ, তা এখন স্মরণ করে প্রতি বছর রোযা রাখার প্রয়োজন নেই; বরং নিয়ামত পাবার দিনকে স্মরণ করে উদযাপন করার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। 

তিন. 
মূসা আলাইহিস সালাম’র মুক্তির দিনকে স্মরণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং নিজেও রোযা রেখেছেন এবং তাঁর উম্মতদেরকে এ রোযা রাখার নির্দেশ দেন। 
সুতরাং নিয়ামতের দিনকে সৎকাজের মাধ্যমে উদযাপন করা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'কে পাবার দিনকে স্মরণ করে ঈদে মিলাদুন্নবি উদযাপন করা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর সুন্নাত।

বিশ্বখ্যাত ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ূতী আলাইহির রাহমাহ বলেন-

وقد سئل شيخ الإسلام حافظ العصر ابو الفضل ابن حجر عن عمل المولد فأجاب بما نصه : قال وقد ظهر لي تخريجها على أصل ثابت وهو ثبت في الصحيحين من - ان النبي صلى الله عليه وسلم قدم المدينة فوجد اليهود يصومون يوم عاشوراء فسالهم فقالوا: هو يوم أغرق الله فيه فرعون ونجى موسى فنحن نصومه شكرا لله تعالى فيستفاد منه فعل الشكر لله تعالى على ما من به في يوم معين من اسداء نعمة أو دفع نقمة ويعاد ذلك في نظير ذلك اليوم من كل سنة والشكر لله تعالى يحصل العبادات كالسجود والصيام و الصدقة والتلاوة وأي 
نعمة أعظم من النعمة بيروز هذا النبي صلى الله عليه وسلم الذي هو بني الرحمة في ذلك اليوم له
“(বিশ্ববিখ্যাত হাদিস বিশারদ) শাইখুল ইসলাম ইবনু হাজর আসকালানীকে ঈদে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপনের ভিত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপনের মূল ভিত্তি আমার নিকট সুস্পষ্ট হয়েছে, যা সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিম শরিফে রয়েছে। সেই ভিত্তিটা হল- নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা শরিফে আগমন করলে, তিনি সেখানকার ইয়াহুদিদেরকে আশুরার দিনে রোযা রাখতে দেখে তাদেরকে এ রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। অতঃপর তারা বলল, এ দিনে আল্লাহ তায়ালা ফিরয়াউনকে ডুবিয়ে মেরেছেন আর হযরত মূসা আলাইহিস সালাম কে মুক্তি দিয়েছেন। এ কারণে আমরা আল্লাহ তায়ালার শোকরিয়া জ্ঞাপনার্থে রোযা রাখছি। এ হাদিছ শরিফ থেকে প্রমাণিত হয় যে, নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর রহমত পাবার কারণে বা কোন বিপদ থেকে মুক্তি লাভের পর আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপন করা বৈধ। প্রতি বছর সেই একই দিনে আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপন করা যাবে আর আল্লাহ তায়ালার শোকরিয়া জ্ঞাপন বিভিন্ন রকম ইবাদতের মাধ্যমে করা যায় যেমন নামায, রোযা, সদকা এবং কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি। আমাদের জন্য যেদিন নবি করিম রাহমাতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেন, সেদিনের চেয়ে বড় নিয়ামত আর কী হতে পারে?”
[সূত্রঃ ইমাম সুয়ূতী, হুসনুল মাক্বছাদ, ফি আমলিল মাওলিদ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৪০৫হি., পৃ. ৬৩; ইমাম সুয়ূতী, আল হাবী লিল ফাতাওয়া, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৪২১ হিজরী, খ. ১ম, পৃ. ১৮১।] 
উল্লিখিত বর্ণনা থেকে বোঝা গেল যে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ইমাম ইবনু হাজর আসকালানী আলাইহির রাহমাহ আশুরার হাদিছকে ‘ঈদে মিলাদুন্নবি’ উদযাপনের গ্রহণযোগ্য ভিত্তি বলেছেন এবং তা প্রতি বছর পালনের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। 
সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবি উদযাপন করা শরিয়ত সম্মত একটি সৎকাজ। 

২. হযরত আবু ক্বাতাদাহ আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন-

إن رسول الله صلى الله عليه وسلم سئل عن صوم يوم الاثنين قال: ذاك يوم ولدت فيه ويوم بعثت او أنزل على فيه
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম কে সোমবারে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন, সেদিন আমার জন্ম হয়েছে, আমি নবি হিসেবে প্রেরিত হয়েছি এবং আমার ওপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে।”
[সূত্রঃ ইমাম মুসলিম, প্রাগুক্ত, হাদিছ ১১৬২, খ. ২য়, পৃ. ৮১৯; ইমাম বায়হাক্কী, আস্-সুনানুল কুবরা, মাকতাবাতু দারিল বায, মক্কা শরিফ, ১৪১৪ হিজরী, হাদিছ ৮১৮২, খ. ৪র্থ, পৃ. ২৮৬।]
উল্লিখিত হাদিছ শরিফ থেকে বোঝা গেল যে, তিনি জন্মদিন উপলক্ষে রোজা রাখার মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপন করতেন। 
সুতরাং আল্লাহর নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপনার্থে ‘ঈদে মিলাদুন্নবি’ উদযাপন করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর সুন্নাত। 

৩. হযরত আউস বিন আউস রাদ্বিয়অল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أن من أفضل اياكم يوم الجمعة فيه خلق آدم 
“তোমাদের দিনসমূহের মধ্যে শুক্রবার শ্রেষ্ঠতর দিন। (কারণ) এ দিনে হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
[সূত্রঃ ইমাম আবু দাউদ, প্রাগুক্ত, হাদিছ ১০৪৭, খ. ১ম, পৃ. ২৭৫; ইমাম ইবনু মাজাহ্, প্রাগুক্ত, হাদীছ ১০৮৫, খ. ১ম, পৃ. ৩৪৫।] 

হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أن يوم الجمعة يوم عيد 
“নিশ্চয় শুক্রবার হল ঈদের দিন।”
[সূত্রঃ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, মুসনাদ, প্রাগুক্ত, হা. ৮০১২, খ. ২য়, পৃ. ৩০৩; ইমাম ইবনু খুযাইমা, প্রাগুক্ত, হা. ২১৬১, খ. ৩য়, পৃ.৩১৫; ইমাম হাকিম, আল-মস্তাদরাক, দারুল বায লিন-নশর ওয়াত্তাওযী, মক্কা শরিফ, সৌদিআরব, হাদীছ ১৫৯৫, খ. ১ম, পৃ. ৬০৩।]

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়অল্লাহু তায়ালা আনহুমা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أن هذا يوم عيد جعله الله للمسلمين فمن جاء إلى الجمعة فليغسل وإن كان طيب فليمس منه وعليكم بالسواك
“নিশ্চয় এ দিন ( শুক্রবার) ঈদের দিন, যাকে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি জুমার নামায পড়তে আসে, সে যেন গোসল করে আসে আর তার কাছে যদি সুগন্ধি থাকে, তাহলে সে যেন তা থেকে কিছু শরীরে লাগিয়ে আসে। তোমাদের ওপর মিসওয়াক করা আবশ্যক।”
[সূত্রঃ ইমাম ইবনু মাজাহ্, প্রাগুক্ত, হা. ১০৯৮, খ. ১ম, পৃ. ৩৪৯; ইমাম তাবরানী, আল-ম’জামূল আওসাত্ব, মাকতাবাতুল মারিফ, রিয়াদ, ১৪০৫হি. হা. ৭৩৫৫, খ. ৭ম, পৃ. ২৩০।]
উল্লিখিত হাদিছসমূহ থেকে বোঝা গেল যে, শুক্রবার হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার কারণে সেদিনকে উত্তম দিন এবং ঈদের দিন বলা হয়েছে। সুতরাং যেদিন সৃষ্টি জগতের মধ্যে সর্বশেষ্ঠ নবি আগমন করেছেন, সেদিনকে কেন ঈদের দিন হিসেবে মানা যাবে না?

৪. হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন-

إن النبي صلى الله عليه وسلم عق عن نفسه بعد النبوة
“নবুয়ত প্রকাশের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই নিজের আক্বীক্বাহ করেছেন।”
[সূত্রঃ ইমাম বায়হাকী, আস্-সুনানুল কুবরা, প্রাগুক্ত, হা. ৪৩, খ. ৯ম. পৃ. ৩০০; ইমাম ইবনু হাজর আসালানী, প্রাগুক্ত, খ. ৯ম, পৃ. ৫৭৫।] 
এ হাদিছের ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত ইমাম জালাল উদ্দিন সূয়ূতী (রহমাতুল্লহি 'আলাইহি) বলেন-

ان جده عبد المطلب عق عنه في سابع ولادته والعقيقة لاتعاد مرة ثانية فيحمل ذلك على أن الذي فعله النبي صلى الله عليه وسلم إظهارا للشكر على إيجاد الله تعالى رحمة للعالمين وتشريفا لامته كما كان يصلي على نفسه لذلك فيستحب لنا ايضا إظهار الشكر بمولده باجتماع الاخوان وإطعام الطعام ونحو ذلك من وجوه القربات وإظهار المسرات
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র দাদা রাসুল্ল্লুাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর জন্মের সপ্তম দিনে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর আকিকা করেন। অথচ আক্বীক্বাহ দু’বার হয় না। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার যে আকীকাহ




ইসলাম ও জীবন - পাতার আরও খবর
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
প্রকাশক ও সম্পাদক :---
"মা নীড়" ১৩২/৩ আহমদবাগ, সবুজবাগ, ঢাকা-১২১৪
ফোন : +৮৮-০২-৭২৭৫১০৭, মোবাইল : ০১৭৩৯-৩৬০৮৬৩, ই-মেইল : sunnibarta@gmail.com