শিরোনাম
ইসলামে কাব্য, কবিতা, কাব্য চর্চা : না'তে রাসূল "মীলাদ শরিফ" কবিতার নাম       আল্লাহর যেকোন অনুগ্রহ ও নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বরুপ ভোজ অনুষ্ঠান ও ইসলাম       কুরআন-সুন্নাহের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ এঁর স্মরনে স্মরনানুষ্ঠান/উদযাপন/পালন       ১২ই রবিউল আউয়াল, নাকি ৯ই রবিউল আউয়াল অথবা ২রা রবিউল আউয়াল       না'ত কবিতা মীলাদ শরীফ দাঁড়িয়ে পাঠ করা বা মীলাদে ক্বিয়াম করা আদাব        পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন       ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺনিয়ে ইমাম মুজতাহিদগনের অভিমত      
আজ রবিবার, ৩ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺনিয়ে ইমাম মুজতাহিদগনের অভিমত
মাহমুদ হাছান
প্রকাশ : ২০১৭-১২-০২ সময় : ১১:০৬,
ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺনিয়ে ইমাম মুজতাহিদগনের অভিমত
ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺ নিয়ে ইমাম মুজতাহিদগনের অভিমত

ইমাম মুজতাহিদগনের অভিমত সমূহঃ
১. প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত হাসান বসরী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন-
ﻗﺎﻝ ﺣﺴﻦ ﺍﻟﺒﺼﺮﻱ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﯽ ﻋﻨﻪ ﻭﺩﺩﺕ ﻟﻮ ﮐﺎﻥ
ﻟﯽ ﻣﺜﻞ ﺟﺒﻞ ﺍﺣﺪ ﺫﮬﺒﺎ ﻓﺎﻧﻔﻘﺘﻪ ﻋﻠﯽ ﻗﺮﺍﺀﺓ ﻣﻮﻟﺪ ﺍﻟﻨﺒﻲ
ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﯿﻪ ﻭﺳﻠﻢ
অর্থাৎ- যদি আমার উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত তাহলে আমি তা রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এঁর ঈদ-ই-মিলাদুন্নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাহফিলে খরচ করতাম।
[সূত্রঃ আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১১।]

২. হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন যে ব্যক্তি ঈদ-ই-মিলাদুন্নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ উপস্থিত হয়ে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেছে, সে ঈমানের সফলতা লাভ করেছে।
[সূত্রঃ আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১১।]

৩. হযরত মারুফ কারখী (রাহমাতুল্লাহি
আলাইহি) বলেন যে ব্যক্তি ঈদ-ই-মিলাদুন্নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষে পানাহারের আয়োজন করে মুসলিমদের ভাইদের একত্রিত করে, আলোকসজ্জা করে, নতুন পোষাক পরিধান করে এবং খুশবো, আতোর, গোলাপ ও লোবান প্রয়োগে নিজেকে সুগন্ধিযুক্ত করে; রোজ কিয়ামতে প্রথম শ্রেণীর নবীদের সাথে তার হাশর হবে এবং ইল্লীঈনের সর্বোচ্চ স্থানে সে অবস্থান করবে।
[সূত্রঃ আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১১।]

৪. শাফেঈ মাযহাবের প্রবর্তক ইমাম শাফেঈ (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন যদি কোন ব্যক্তি ঈদ-ই-মিলাদুন্নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষে মুসলিম ভাইদেরকে খাবার তৈরী করে মজলিসে আপ্যায়ন করে ও ইবাদাত সম্পন্ন করে, রোজ কিয়ামতে সিদ্দীকিন, শাহাদা ও সালেহীনদের সাথে তার হাশর হবে এবং জান্নাতুন নাঈমে সে অবস্থান করবে।
[সূত্রঃ আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১৩।]

৫. ৯ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, তিনি তার স্ব-রচিত “আল উয়াছায়েল ফী শরহিশ শামাইল” গ্রন্থে উল্লেখ আরও করেন, “যে গৃহে বা মসজিদে কিংবা মহল্লায় মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তখন অবশ্যই সে গৃহ বা মসজিদ বা মহল্লা অসংখ্য ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে এবং উক্ত স্থান সমূহে যারা অবস্থান করে তাদের জন্য তারা সালাত পাঠ করে। (অর্থাৎ তাদের গুণাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে) এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে সাধারণভাবে রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা ভূষিত করেন। অতঃপর নূরের মালা পরিহিত ফেরেশতাকুল বিশেষতঃ হযরত জিব্রাঈল, মীকাঈল, ঈস্রাফীল ও আজরাঈল আলাইহিস সালাম মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে মাহফিল আয়োজনকারীর গুণাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন”।
তিনি আরো বলেন, “যে মুসলমানের গৃহে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ পাঠ করা হয়, সে গৃহ ও গৃহে বসবাসকারী ব্যক্তি দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অগ্নি, পানি, পরনিন্দা, কুদৃষ্টি ও চুরি ইত্যাদির আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবে। সে ঘরে যার মৃত্যু হবে সে মৃত ব্যক্তি কবরে মুনকার নকীরের প্রশ্নের উত্তর অতি সহজে দিতে পারবে। যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ কে সম্মান করতে চায়, তার জন্য ইহাই যথেষ্ট। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির নিকট নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদের কোন মর্যাদা নেই, তার অন্তর এত নিকৃষ্ট হয়ে পড়বে যে, তার সামনে হুযুরপুর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশ্বজোড়া প্রশংসাগীতি উচ্চারিত হলেও তার অন্তরে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য বিন্দুমাত্র মুহাব্বতের উদ্রেক হবে না”।
[সূত্রঃ আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং- ১৩ ও ১৪।]

৬. বুখারী শরীফের ব্যাখাকার বিশ্ববিখ্যাত মোহাদ্দিস আল্লামা কুস্তোলানী রহমাতুল্লাহে আলাইহি (মৃত্যুঃ ৯২৩ হিজরী) বলেন-
“যে ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভাগমনের মোবারক মাসের রাতসমূহকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার উপরে রহমত বর্ষণ করেন। আর উক্ত রাত্রকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করবে এ জন্য যে, যাদের অন্তরে (নবী বিদ্বেষী) রোগ রয়েছে। তাদের ঐ রোগ যেন আরো শক্ত আকার ধারণ করে এবং যন্ত্রণায় অন্তর জ্বলে পুড়ে যায়”।
[সূত্রঃ শরহে জুরকানী আলাল মাওয়াহেব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং- ২৬২।]

৭. হযরত সাররী সাক্বত্বী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ) বলেন “যে ব্যক্তি মিলাদ শারীফ পাঠ বা মিলাদুন্নাবী (সাঃ) উদযাপন করার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করল, সে যেন তার জন্য জান্নাতে রওজা বা বাগান নির্দিষ্ট করল। কেননা সে তা হুজুর পাক (দঃ) এর মহব্বতের জন্যই করেছে।”
[সূত্রঃ আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং- ১৩।]

৮. ক/ প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীব আলেম উপমহাদেশে যিনি হাদীছ শাস্ত্রের প্রচার-প্রসার করেছেন, ইমামুল মুফাসসিরীন ওয়াল মুহাদ্দিছীন ওয়াল ফুক্বাহা হযরত শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,
من عظم ليلة مولده بما امكنه من التعطيم والاكرام كان من الفايزين بدار السلام.
অর্থাৎ যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফের দিবসকে (অর্থাৎ মিলাদুন্নবীকে) তা’যীম করবে এবং সে উপলক্ষে ঈদ উদযাপন করবে সে চিরশান্তিময় জান্নাতের অধিকারী হবে।” (সুবহানাল্লাহ্)
[সূত্রঃ ইবনু নাবাতা, আল বাইয়্যিনাত ১৫৯/৩০)।]

খ/ ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বপ্রথম মোহাদ্দিস হযরত শায়খ আবদুল হক মোহাদ্দেসে দেহলভী রহমাতুল্লাহে আলাইহি আরও বলেন-
“যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রাত্রকে ঈদ হিসেবে পালন করে, তার উপর আল্লাহ তায়ালা রহমত নাযিল করেন। আর যার মনে হিংসা এবং [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুশমনির] রোগ রয়েছে, তার ঐ (নবী বিদ্বেষী) রোগ আরও শক্ত আকার ধারণ করে”।
[সূত্রঃ মা সাবাতা বিসসুন্নাহ (উর্দু) পৃষ্ঠা
নং-৮৬।]

৯. যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম যাহাবী (রহমাতুল্লাহি 'আলাইহি) প্রায় ৬০০ বছর আগে মিলাদুন্নবী (صلى الله عليه و آله و) এঁর মাহফিল এবং প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে মিলাদুন্নবী (صلى الله عليه و آله و) উদযাপনকারী বাদশাহ মুজাফফর (রহমাতুল্লাহি 'আলাইহি) এঁর উচ্চ প্রশংসা করেছেন এভাবেঃ
"মালিক মুজাফফর (রহমাতুল্লাহি 'আলাইহি) এঁর দ্বারা আয়োজিত মীলাদুন্নবী (صلى الله عليه و آله و) এঁর মাহফিলের বর্ণনা দেওয়ার মত ভাষা নাই। আরব এবং ইরাক এর লোকেরা খুশির সাথে মাহফিলে যোগদান করত। তিনি একজন ধার্মীক সুন্নি ছিলেন এবং তিনি ফুক্বাহা ও মুহাদ্দিসগণকে অনেক ভালবাসতেন।" (সুবাহানাল্লাহ)
[সূত্রঃ ইমাম যাহাবী, তারিখুল ইসলাম, ভলিউম ৪৫, পৃষ্ঠা ৪০২-৪০৫ দার আল-কুতুব আল-আরাবি প্রকাশনী, বেইরুত/লেবানন)।]

১০. ভারত উপমহাদেশের যুগশ্রেষ্ঠ আলেম শাহ ওলীউল্লাহ মোহাদ্দীসে দেহেলভী (রহমাতুল্লাহি 'আলাইহি) প্রায় ৩০০ বছর আগে নিজের রচিত ‘ফুইউজুল
হারামাইন’ কিতাবের ৮০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
ﻭﻛﻨﺖ ﻗﺒﻞ ﺫﻟﻚ ﺑﻤﻜﺔ ﺍﻟﻤﻌﻈﻤﺔ ﻓﻰ ﻣﻮﻟﺪ ﺍﻟﻨﺒﻰ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻰ
ﻳﻮﻡ ﻭﻻﺩﺗﻪ ﻭﺍﻟﻨﺎﺱ ﻳﺼﻠﻮﻥ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻨﺒﻰ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺬﻛﺮﻭﻥ
ﺍﺭﻫﺎﺻﺎﺗﻪ ﺍﻟﺘﻰ ﻇﻬﺮﺕ ﻓﻰ ﻭﻻﺩﺗﻪ ﻭﻣﺸﺎﻫﺪﻩ ﻗﺒﻞ ﺑﻌﺜﺘﻪ ﻓﺮﺃﻳﺖ ﺍﻧﻮﺍﺭﺍ
ﺳﻄﻌﺖ ﺩﻓﻌﺔ ﻭﺍﺣﺪﺓ ﻻ ﺍﻗﻮﻝ ﺍﻧﻯﺎﺩﺭﻛﺘﻬﺎ ﺑﺒﺼﺮﺍﻟﺠﺴﺪ ﻭﻻ ﺍﻗﻮﻝ ﺍﺩﺭﻛﺘﻬﺎ
ﺑﺒﺼﺮ ﺍﻟﺮﻭﺡ ﻓﻘﻂ ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺍﻋﻠﻢ
ﻛﻴﻒ ﻛﺎﻥ ﺍﻻﻣﺮ ﺑﻴﻦ ﻫﺬﺍ ﻭ ﺫﻟﻚ ﻓﺘﺄﻣﻠﺖ ﺗﻠﻚ ﺍﻻﻧﻮﺍﺭ ﻓﻮﺟﺪﺗﻬﺎ ﻣﻦ ﻗﺒﻞ
ﺍﻟﻤﻼﺋﻜﺔ ﺍﻟﻤﺆﻛﻠﻴﻦ ﺑﺎﻣﺜﺎﻝ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﻤﺸﺎﻫﺪ ﻭﺑﺎﻣﺜﺎﻝ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﻤﺠﺎ ﻟﺲ ﻭﺭﺍﻳﺖ
ﻳﺨﺎﻟﻄﻪ ﺍﻧﻮﺍﺭ ﺍﻟﻤﻼﺋﻜﺔ ﺍﻧﻮﺍﺭ ﺍﻟﺮﺣﻤﺔ ০
‏( ﻓﻴﺾ ﺍﻟﺤﺮﻣﻴﻦ ৮০ )

অর্থাৎঃ আমি ইতোপূর্বে হযরতের আগমনের (মিলাদুন্নবীর) দিবসে মক্কা শরীফে উপস্থিত ছিলাম এবং লোকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ শরীফ পাঠ করছিলেন, তাঁর পয়দায়েশের সময় যে অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশিত হয়েছিল ও তাঁর নবুয়ত লাভের আগে যে সমস্ত
ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছিল, সেসব উল্লেখ করছিলেন, এমতাবস্থায় আমি কতগুলো নূর হঠাৎ প্রকাশিত হতে দেখলাম, আমি বলতে পারিনি যে, এ নূরগুলো চর্মচক্ষে দেখেছিলাম এবং ইহাও
বলতে পারি না যে, এগুলো কেবলমাত্র অন্তরচক্ষুতে দেখেছিলাম।
এ দুটোর মধ্যে প্রকৃত ব্যাপার কী ছিল, তা আল্লাহপাকই সমধিক অবগত আছেন।
তারপর আমি এই নূরগুলি সম্পর্কে চিন্তা করে বুঝলাম যে, ফেরেশতাগণ এ প্রকারের ঘটনাবলী ও মজলিশসমূহের জন্য নিয়োজিত হয়েছেন, এগুলো তাঁদের নূর, আরো দেখতে পেলাম যে, ফেরেশতাগণের নূরগুলোর সাথে আল্লাহর রহমতের নূরগুলো মিলিত হচ্ছে।"
[সূত্রঃ শাহ ওলীউল্লাহ মোহাদ্দীসে দেহেলভী (রহমাতুল্লাহি 'আলাইহি) : ‘ফুইউজুল হারামাইন’, ৮০ পৃষ্ঠা।]
উপরোক্ত ঘটনার আলোকে আমাদের সামনে কয়েকটি বিষয় সুষ্পষ্ট হলঃ
(ক) মক্কা শরীফে প্রতি বছর মুসলমানগণ মিলাদুন্নবী মাহফিল আয়োজন করে থাকেন।
(খ) শাহ অলি উল্লাহ
মুহাদ্দিসে দেহলভী (ররহমাতুল্লহি 'আলাইহি) মক্কা শরীফে আয়োজিত মিলাদ মাহফিলে যোগদান করেছিলেন।
(গ) শাহ অলি উল্লাহ
মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহমাতুল্লহি 'আলাইহি) মিলাদুন্নবী মাহফিলকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। এ কারণেই তিনি মক্কা শরীফে আয়োজিত মিলাদুন্নবীর মাহফিলকে ত্যাগ করেননি।
(ঘ) মিলাদুন্নবীর মাহফিলেল আল্লাহ তা’য়ালার ফেরেশতাগণ এবং আল্লাহ তা’য়ালার রহমতের নূর নাজিল হয়ে থাকে।
(সুবাহানাল্লাহ)

১১. হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব ‘রদ্দুল মুহতার আলা দুররুল মুখতার’ কিতাবে বর্ণিত আছে,

أَنَّ أَفْضَلَ اللَّيَالِي لَيْلَةُ مَوْلِدِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ لَيْلَةُ الْقَدْرِ ، ثُمَّ لَيْلَةُ الْإِسْرَاءِ وَالْمِعْرَاجِ ، ثُمَّ لَيْلَةُ عَرَفَةَ ، ثُمَّ لَيْلَةُ الْجُمُعَةِ ، ثُمَّ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ ، ثُمَّ لَيْلَةُ الْعِيدِ
অর্থাৎ রাত সমূহের মধ্যে উত্তম রাত হচ্ছে পবিত্র মীলাদুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাত, অতপর লাইলাতুল কদরের রাত, অতপর মিরাজ শরীফের রাত, অতপর আরাফার রাত, অতপর জুমুয়ার রাত, অতপর ১৫ শাবানের রাত, অতপর ঈদের রাত।”
[সূত্রঃ রদ্দুল মুহতার আলা দুররুল মুখতার ৮/২৮৫ (শামেলা) (ফতোয়ায়ে শামী), পুরাতন ছাপা ৫০৫ পৃষ্ঠা।]

উক্ত কওল শরীফ হানাফী মাযহাবের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফতওয়ার কিতাব “রদ্দুল মুহতার” বা "ফতোয়ায়ে শামী" তে থাকার মাধ্যমে এটা মাযহাবের একজন নির্ভরযোগ্য ইমামের ফতওয়া হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছে। 
কাজেই কেউ হানাফী মাযহাবের অনুসারী হলে তাকে অবশ্যই এই ফতওয়া মানতে হবে।
সুতরাং, এরপর থেকে বিশ্ববিখ্যাত মনিষীগণের বক্তব্য অস্বীকার করে পথেঘাটের কাঠমুল্লা ছাটমুল্লাদের কথা শুনে আর কেউ মিলাদুন্নবী (صلى الله عليه و آله و)'কে সিরাতুন্নবী (صلى الله عليه و آله و) বলে এবং মিলাদুন্নবী (صلى الله عليه و آله و) পালন করাকে হারাম, বেদাত, গুনাহর কাজ ইত্যাদি বলে বেঈমান, মুনাফেক হবেন না।

এখন যারা মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করাকে শিরক, হারাম ও বিদয়াত ইত্যাদি ফতোয়া দিয়ে থাকেন তাদেরকে উপরোক্ত মুহাদ্দীসের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য নসিহত করা গেল।
তাদের থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের ঈমানকে পরিশুদ্ধ করার আহ্বান করা গেল।
তাদের ইলমে হাদীসের ক্ষেত্রে অবদান না থাকলে, আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশের বর্তমান আলেমগণ হাদীস কি শাস্ত্র তাও চিনতেন না।
[সূত্র: ‘তাওয়ারীখ-ই হাবীব-ই ইলাহ্’]

‘‘এ তারিখেই সমস্ত শহরে মুসলমানদের ‘জশনে মিলাদ’ উদ্যাপনের নিয়ম রয়েছে।’’ 
[সূত্র: সীরাতে হালবিয়্যাহ ১ম খণ্ডঃ ৯৩ পৃ,
‘যুরক্বানী আলাল মাওয়াহিব’ঃ ১ম খণ্ডঃ ১৩২ পৃষ্ঠা]

প্রাচীন যুগের মক্কাবাসীদের মধ্যে প্রচলিত নিয়মের সংক্ষিপ্ত বিবরণঃ
মুহাদ্দিস ইবনুল জূযী (ওফাতঃ ৫৯৭ হি.) বলেছেন,
‘‘হেরমাঈন শরীফাঈন (মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফ), মিশর, সিরিয়া, সমস্ত আরব দেশ এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মুসলমানদের মধ্যে পুরানা যুগ থেকে এ নিয়মই চলে এসেছে যে, রবিউল আউয়ালের চাঁদ দেখতেই তাঁরা মিলাদ শরীফের মাহফিলসমূহ আয়োজন করতেন, খুশী উদ্যাপন করতেন, গোসল করতেন, উন্নত মানের পোশাক পরিধান করতেন, বিভিন্ন ধরনের সাজসাজ্জা করতেন, খুশ্বু লাগাতেন, এ দিনগুলোতে (রবিউল আউয়াল) খুব খুশী ও আনন্দ প্রকাশ করতেন, সামর্থ্যানুসারে লোকজনের জন্য টাকা-পয়সা ও জিনিসপত্র খরচ করতেন এবং মিলাদ শরীফ পাঠ ও শ্রবণের প্রতি পূর্ণাঙ্গ গুরুত্ব দিতেন। এরই মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান প্রতিদান ও মহা সাফল্যাদি অর্জন করতেন।
মিলাদ শরীফের খুশী উদযাপনের পরীক্ষিত বিষয়াদির উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- গোটা বছর অধিক পরিমাণে কল্যাণ ও বরকত, সুখ ও শান্তি, জীবিকা, মাল-দৌলত এবং আওলাদে আধিক্য লাভ হয়। আর শহরগুলোতে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি এবং ঘর-বাড়িতে অনাবিল শান্তি জশনে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘য়ালা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এরই বরকতে বিরাজমান থাকে।’’ 
[সূত্র: ‘বয়ানুল মীলাদিন্নবভী’, কৃত. ইবনে জূযীঃ ৫৭ ও ৫৮ পৃ.] 

ইমাম আহমদ ক্বাস্তলানী রহঃ বলেছেন-
‘‘আল্লাহ্ তা’আলা অসংখ্য রহমত নাযিল করুন ওই ব্যক্তির উপর, যে মিলাদ-ই পাকের মাস রবিউল আউয়াল-এর রাতগুলোকে ঈদের এমন খুশীর রাতে পরিণত করে যে, যার অন্তরে শানে রেসালতের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষের রোগ-ব্যাধি রয়েছে তার অন্তরের উপর ক্বিয়ামত সংঘটিত হয়ে যায়।’’
[সূত্র: ‘আল-মাওয়াহিব’ যারক্বানীসহ ১ম খণ্ড ১৩৯ পৃ.।]

মোল্লা আলী ক্বারী (ওফাত ১০১৪ হিঃ) হানাফী রহঃ বলেছেন-

اَمَّا اَہْلُ مَکَّۃَ یَزِیْدُ اِہْتِمَامَہُمْ بِہٖ عَلٰی یَوْمِ الْعِیْدِ
অর্থাৎ ‘‘মক্কাবাসীগণ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম শরীফের প্রতি গুরুত্ব ঈদ অপেক্ষাও বেশী দিতেন।’’ 
[সূত্র: ‘আল-মাওরেদ-আর রাভী’, মক্কা মুকাররামাহ্য় মুদ্রিত: ২৮ পৃ.।]

শাহ্ ওয়ালী উল্লাহর পর্যবেক্ষণঃ
শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী বলেছেন, 
‘‘আমি একবার মক্কা মু‘আয্যমায় মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর পবিত্র জন্মের স্থানে উপস্থিত ছিলাম। তখন লোকেরা হুযূরের ওই সব মু’জিযা বর্ণনা করছিলেন, যেগুলো হুযূরের শুভাগমনের পূর্বে ও হুযূরের নুবূয়ত প্রকাশের পূর্বে প্রকাশ পেয়েছিলো। তখন আমি হঠাৎ দেখতে পেলাম- সেখানে জ্যোতিসমূহেরই ছড়াছড়ি। তখন আমি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলাম ও বুঝতে পারলাম, ওই ‘নূর’ (জ্যাতি) হচ্ছে- ওইসব ফিরিশতারই, যাঁদেরকে এমন মাহফিলসমূহের (মীলাদ শরীফ ইত্যাদি) জন্য নিয়োজিত রাখা হয়েছে। অনুরূপ, আমি দেখেছি ‘রহমতের নূর’ ও ‘ফিরিশ্তাদের নূর’ সেখানে মিলিত হয়েছে।’’ 
[সূত্রঃ ‘ফুয়ূযুল হেরমাঈন’, আরবী-উর্দুঃ ৮০-৮১পৃ.।]

শীর্ষস্থানীয় দেওবন্দী ব্যক্তিবর্গের পীর-মুর্শিদের বাণীঃ
হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজির-ই মক্কী সাহেব বলেছেন, ‘‘মওলেদ শরীফ (মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সমস্ত হেরমাঈন শরীফাঈনবাসীই উদ্যাপন করেন। আমাদের জন্য এতটুকু দলীলই যথেষ্ট।’’
[সূত্র: ‘আশ্মাম-ই ইমদাদিয়াহ ৪৭ পৃ.।]

মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাব নজদীর পুত্রের ফাতওয়াঃ
শায়খ আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নজদী লিখেছেন, 
‘‘কট্টর কাফির আবূ লাহাব নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর বেলাদতের খুশীতে তার ক্রীতদাসী সুয়ায়বাহকে আযাদ করার ফলে সে কবরে প্রতি সোমবার (বেলাদত শরীফের দিন) শান্তিদায়ক পানীয় (শোষণ) করার জন্য পেয়ে থাকে। সুতরাং ওই একত্ববাদী মুসলমানদের কী অবস্থা হবে (অর্থাৎ সে কী কী নি’মাত লাভ করবে), যে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর খুশী উদ্যাপন করে থাকে!’’ (সংক্ষিপ্ত)
[সূত্র: ‘মুখতাসার সীরাতুর রসূল’ ১৩ পৃষ্ঠা, হাফেয আবদুল গফূর আহলে হাদীস, ঝীলাম কর্তৃক প্রকাশিত।]
আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে আমল করারও তৌফিক দিন!
সুতরাং এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হল যে, ১২ রবিউল আউয়াল শরীফ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এরই মহান দিবস।

=।।দুই।।=
১২ রবিউল আউয়ার শরীফ কি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত দিবসও?
নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর ওফাত শরীফের তারিখ সম্পর্কে সাহাবা কেরাম থেকে চার ধরনের অভিমত বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। 
যেমন- 
রেওয়ায়ত- ১. ১২ রবিউল আউয়াল। 
এটা হযরত আয়েশা ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা ওয়া আন্হুমা) থেকে বর্ণিত।

রেওয়ায়ত-২. ১০ রবিউল আউয়াল। 
এটা হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত।

রেওয়ায়ত-৩. ১৫ রবিউল আউয়াল। 
এটা হযরত আসমা বিনতে আবী বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত।

রেওয়ায়ত-৪. ১১ রমযান। 
এটা হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাস‘ঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত।
[সূত্র: রেওয়ায়ত ১ ও ২ প্রসিদ্ধ কিতাব ‘আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’র ৫ম খণ্ড ২৫৬ পৃ. আর রেওয়াত ৩ ও ৪ ওয়াফা আল-ওয়াফাঃ ১ম খণ্ড, ৩১৮ পৃ.।]

পর্যালোচনাঃ
উল্লিখিত প্রথম রেওয়াত, যাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর ওফাত দিবস ১২ রবিউল আউয়াল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটার ‘সনদ’ বর্ণনাকারীদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে ওমর আল-ওয়াক্বেদী নামক একজন ‘বর্ণনাকারী’ (রাভী) রয়েছেন। তাঁর সম্পর্কে-
ইমাম ইসহাক্ব ইবনে রাহ্ওয়াইহ্, ইমাম আলী ইবনে মদীনী, ইমাম আবূ হাতেম আল-রাযী এবং ইমাম নাসাঈ সর্বসম্মতভাবে বলেছেন, 
‘ওয়াক্বেদী নিজ থেকেই হাদীসসমূহ রচনা করে নিতো।”

ইমাম ইয়াহিয়া ইবনে মু‘ঈন বলেছেন, 
‘‘ওয়াক্বেদী ‘সেক্বাহ্ নয় অর্থাৎ ‘‘নির্ভরযোগ্য নয়।’’

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, 
‘ওয়াক্বেদী কায্যাব (অর্থাৎ মিথ্যাবাদী), হাদীসমূহে পরিবর্তন করে ফেলতো।’’

ইমাম বোখারী ও আবূ হাতেম রাযী বলেছেন,
‘‘ওয়াক্বেদী মাতরুক’ (অর্থাৎ পরিত্যক্ত)।’’

মুররাহ্ বলেছেন, 
‘‘ওয়াক্বেদীর হাদীস লিপিবদ্ধ (উদ্ধৃত) করার উপযোগী নয়।”

ইবনে আদী বলেছেন, 
‘‘ওয়াক্বেদীর হাদীসগুলো ‘তাহরীফ’ (মনগড়াভাবে লিখিত হওয়া) থেকে মুক্ত নয়।’’

যাহাবী বলেছেন, 
‘‘ওয়াক্বেদী অত্যন্ত দুর্বল (রাভী) হওয়ার উপর গবেষক, অনুসন্ধিৎসু ও প্রসিদ্ধ সমালোচক ইমামদের ঐক্যমত্য’ (اجماع) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’’ 
[সূত্র: ‘মীযানুল ই’তিদাল’ ২য় খণ্ডঃ ৪২৫-৪২৬পৃ.।] 
অতএব, ১২ রবিউল আউয়াল শরীফকে ‘ওফাতুন্নবী’ (নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত দিবস) ব্যক্তকারী রেওয়ায়ত’ (বর্ণনা) মোটেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাছাড়া, সেটা এ কথার উপযোগীই নয় যে, দলীল হিসেবে গ্রহণ বা পেশ করা যাবে।

রেওয়াত নম্বর-২ এর সনদের মধ্যে একজন ‘রাভী’ (বর্ণনাকারী) সায়ফ ইবনে ওমর হলেন ‘দুর্বল’। অপর ‘রাভী’ মুহাম্মদ ইবনে ওবায়দুল্লাহ্ আল-আরযমী হলেন ‘মাতরুক’ (পরিত্যক্ত)।
[সূত্র: ‘তাক্বরীব আত-তাহযীবঃ ১৪২, পৃ. ও ২০৩পৃ, খোলাসাতুত্ তাযহীবঃ ১৬১পৃ. ও ৩৫০ পৃ. ‘তাহযীব আল-কামাল’, কৃত আল-খাযরাজী।]

আর রেওয়ায়ত নং ৩ ও ৪-এর ‘সনদ’ই পাওয়া যায় না। অবশ্য, শীর্ষস্থানীয় তাবে’ঈ ইবনে যুহরী, সুলায়মান ইবনে তারখান, সা‘আদ ইবনে ইব্রাহীম যুহরী প্রমুখ থেকে নির্ভরযোগ্য সনদসমূহ সহকারে ১লা কিংবা ২রা রবিউল আউয়ালই ওফাতের তারিখ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
মোটকথা, ১২ রবিউল আউয়ালকে ওফাত দিবস সাব্যস্ত করা না সাহাবা কেরাম থেকে প্রমাণিত, না তাব’ঈন থেকে। 

কাজেই, পরবর্তীতে কিছু সংখ্যক ইতিহাসবেত্তা কর্তৃক ১২ রবিউল আউয়ালকে ওফাত-দিবস সাব্যস্ত করা কোন মতেই দুরস্ত (গ্রহণযোগ্য) হতে পারে না।
এখানে গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয় হচ্ছে-যখন সাহাবা কেরাম (যাঁরা হুযূরের ওফাত শরীফের চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলেন) এবং তাঁদের শাগরিদ তাবে‘ঈগণ থেকে একথা প্রমাণিত নয়, তখন পরবর্তী ঐতিহাসিকগণ কিভাবে একথা জানতে পারলেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘য়ালা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর ওফাত শরীফ ১২ রবিউল আউয়ালই হয়েছে?
এ কারণেই প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য দেওবন্দী ইতিহাসবেত্তা শিবলী নো’মানীও ১ রবিউল আউয়ালকেই হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত দিবস সাব্যস্ত করেছেন। 
[সূত্রঃ সীরাতুন্নবী ২য় খণ্ডঃ ১৭০ পৃ.।] 

মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর পুত্র শায়খ আবদুল্লাহ্ ৮ রবিউল আউয়ালকে ‘ওফাত-দিবস’ লিখেছেন। 
[সূত্র : মুখতাসার সীরাতুর রসুলঃ ৯ পৃ.।] 

‘জ্যোতির্বিদ্যা’ ও বর্ষপঞ্জিকা নির্ণয় শাস্ত্র মতেও ১২ রবিউল আউয়ালকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের ওফাত দিবস সাব্যস্ত করা যায় না। 

প্রসিদ্ধ গবেষক ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ইমাম আবুল কাসেম আবদুর রহমান সোহায়লী (ওফাত ৫৮১ হিজরি) বলেছেন-

وَکَیْفَمَادَارَ الْحَالُ عَلٰی ہٰذَ االْحِسَابِ فَلَمْ یَکُنِ الثَّانِیْ عَشَرَ مِنْ رَبِیْعِ الْاَوَّّلِ یَوْمَ الْاِثْنَیْنِ بِوَجْہٍ
অর্থাৎ ‘‘এই হিসাবের উপর যে কোন অবস্থাই প্রদক্ষিণ করুক, কিন্তু (একই সাথে) ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার ‘ওফাত দিবস’ কোন মতেই আসতে পারে না।
এ বিষয়বস্তুটিই (অভিমত) অতি শক্তিশালী ভাষায় সুপ্রসিদ্ধ মুসলিম দার্শনিক ও ইতিহাসবেত্তা মুহাম্মদ শামসুদ্দীন আল-যাহাবী, ইবনে আসাকির, ইবনে কাসীর, ইমাম নূরুদ্দীন আলী ইবনে আহমদ আল-সামহুদী, আলী ইবনে বোরহান উদ্দীন আল-হালবী প্রমুখও বর্ণনা করেছেন।
[সুত্র: ইমাম যাহাবীকৃত ‘তারিখ-ই ইসলাম, ‘আস্-সীরাত আন্ নবভিয়্যাহ্’ অধ্যায়: পৃষ্ঠা-৩৯৯-৪০০ এবং ওয়াফা আল-ওয়াফাঃ ১ম খণ্ড ৩১৮ পৃষ্ঠা, ‘আল-বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ্, ৫ম খণ্ডঃ ২৫৬পৃ, সীরাতে হালবিয়াহঃ ৩য় খণ্ডঃ ৪৭৩ পৃষ্ঠা ইত্যাদি।]

মোটকথা, ১২ রবিউল আউয়াল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর পবিত্র ‘ওফাত-দিবস’ হওয়া কোন মতেই প্রমাণিত হতে পারে না; না যুক্তি-তর্কে, না কোন সুস্পষ্ট দলীলের উদ্ধৃতির ভিত্তিতে, না কোন ‘রাভী’র বর্ণনার ভিত্তিতে, না কারো চিন্তা-ভাবনা বা গবেষণার ভিত্তিতে। অবশ্য ‘সোমবার’ ওফাত শরীফ হওয়ার ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। এর পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। 
[সূত্রঃ মাদারিজুন্ নুবূওয়াত ইত্যাদি।]
আল্লাহরই জন্য সমস্ত প্রশংসা!
এ কারণেই সারা দুনিয়ার সুন্নী মুসলমান ১২ রবিউল আউয়াল বিশ্বনবী হুযূর পূরনুর সাল্লাল্লাহু তা‘য়ালা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মিলাদ শরীফ’-এঁর খুশীই উদযাপন করে থাকেন। এটা একদিকে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর মহান বাণীরই অনুসরণে তাঁরা করে থাকেন। 
যেমন- আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান-

قُلْ بِفَضْلِ اللّٰہِ وَبِرَحْمَتِہٖ فَبِذَالِکَ فَلْیَفْرَحُوْا ط ہُوَ خَیْرٌ مِمَّا یَجْمَعُوْنَ ط
অর্থাৎ ‘(হে মাহবুব! আপনি বলুন! আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া, এবং সেটারই উপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়!’
[সূরা ইয়ূনুস, আয়াত ৫৮, তরজমা, কানযুল ঈমান, (বঙ্গানুবাদ ৩৯৫পৃ.)] 
কারণ, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘য়ালা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাব (বেলাদত শরীফ)’-ই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় নি’মাত বা অনুগ্রহ। এটা ১২ রবিউল আউয়াল শরীফেই অর্জিত হয়েছে।
অন্যদিকে এ দিনে খুশী উদযাপন করা মুসলমানদের ঈমানেরই দাবি।

=।।তিন।।=
এখন যদি কেউ একথা বলে, ১২ রবিউল আউয়াল শুধু মিলাদুন্নবীর খুশী উদযাপন না করে, ‘ওফাতুন্নবী’র শোকও পালন করা চাই, কেউ যদি মিলাদুন্নবী উদযাপন করাকে শির্ক ও বিদ‘আত ইত্যাদিও বলে বেড়ায়, আবার কেউ কেউ যদি মুসলমানদের মিলাদুন্নবী উদযাপনকে ওফাতুন্নবীর শোক দিবস হিসেবেও আখ্যায়িত করার প্রয়াস পায়, তবে ওদের উক্তিগুলো কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
এর জবাব হচ্ছে- 
প্রথমত আমরা প্রমাণ করেছি যে, ১২ রবিউল আউয়াল ‘মিলাদ-দিবস’ই; ‘ওফাত দিবস’ নয়। এতদ্সত্ত্বেও যদি ওই দিনকে ‘ওফাত-দিবস’ বলে কল্পনাও করা হয়, কিংবা যারা এরূপ বলে বেড়ায় তাদের কথা কিছুক্ষণের জন্য মেনেও নেয়া হয়, তবুও মিলাদ শরীফে-এর খুশী উদযাপন করাই ওইদিনে (তারিখে) জায়েয বা বৈধ থাকবে, আর ওফাতের শোক পালন করা নিষিদ্ধ হবে। কেননা, নি’মাত বা মহা অনুগ্রহের উপর খুশী উদযাপন করা শরীযত মতে, সর্বদা ও বারংবারই বৈধ, প্রশংসিত ও পছন্দনীয়। 
যেমন, হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম ‘মা-ইদাহ’ (খাদ্যভর্তি খাঞ্ছা) অবতীর্ণ হবার দিনকে আপন পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্য ‘ঈদ’ (খুশী) সাব্যস্ত করেছেন। 




ইসলাম ও জীবন - পাতার আরও খবর
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
প্রকাশক ও সম্পাদক :---
"মা নীড়" ১৩২/৩ আহমদবাগ, সবুজবাগ, ঢাকা-১২১৪
ফোন : +৮৮-০২-৭২৭৫১০৭, মোবাইল : ০১৭৩৯-৩৬০৮৬৩, ই-মেইল : sunnibarta@gmail.com