শিরোনাম
ইসলামে কাব্য, কবিতা, কাব্য চর্চা : না'তে রাসূল "মীলাদ শরিফ" কবিতার নাম       আল্লাহর যেকোন অনুগ্রহ ও নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বরুপ ভোজ অনুষ্ঠান ও ইসলাম       কুরআন-সুন্নাহের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ এঁর স্মরনে স্মরনানুষ্ঠান/উদযাপন/পালন       ১২ই রবিউল আউয়াল, নাকি ৯ই রবিউল আউয়াল অথবা ২রা রবিউল আউয়াল       না'ত কবিতা মীলাদ শরীফ দাঁড়িয়ে পাঠ করা বা মীলাদে ক্বিয়াম করা আদাব        পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন       ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺনিয়ে ইমাম মুজতাহিদগনের অভিমত      
আজ রবিবার, ৩ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন
মাহমুদ হাছান
প্রকাশ : ২০১৭-১২-০২ সময় : ১১:১১, সর্বশেষ আপডেট : ২০১৭-১২-০২ সময় : ১১:১৬
পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী ﷺ উদযাপন
প্রিয় পাঠক, প্রথমেই উদযাপন শব্দটি নিয়ে আলোকপাত করা যাক।
দেখুন, উদযাপন শব্দটির অর্থ হচ্ছে মানব জীবনে কোন তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, কোন অনুগ্রহ প্রাপ্তির দিন, কিংবা কোন খুশির লগ্ন, বা শুভক্ষণ বা ঘটনাকে ব্যক্তিগতভাবে বা সামাজিকভাবে সমাজের সকলে মিলে সকলের অংশগ্রহণে সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বছরের নির্দিষ্ট দিনে, কিংবা আনন্দ প্রকাশের মাধ্যমে সম্পাদন করা, চর্চা করা, স্মরণ করা, আলোচনা করা।
আর এই সম্পাদন, চর্চা, স্মরণ, আলোচনা বা আলোচনার ব্যবস্থাই হচ্ছে উদযাপন। এই উদযাপন উদযাপিত হয় বিভিন্ন স্মরণানুষ্ঠান বা স্মরণ সভার মাধ্যমে।

পবিত্র রবিউল আউয়ালে এই বিশ্ব ভূবনে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশাকালে মানবতার মুক্তির দিশারী হিসেবে খাতামুন নাবিয়্যিন, রউফুর রহীম হুজুর কারিম (صلى الله عليه و آله و سلم) এই ধরিত্রীতে তাশরীফ রাখেন।
দিনটি সৃষ্টিজগতে অতীব তাৎপর্যবহ, তা এ কারণে যে হুজুর কারিম (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর শুভাগমন দিনটি আল্লাহ্ (سبحانه و تعالى) এঁর অনুগ্রহরাজীর মধ্যে অদ্বিতীয়, সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ। এ অনুগ্রহ প্রাপ্তির কৃতজ্ঞতা চিরকাল করা হলেও সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন অপূর্ণই থাকবে। 
হুজুর কারিম (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর শুভাগমন ঐতিহাসিকভাবেও ঘটনাবহ। কাজেই ঈমানদারদের হৃদয় পটে প্রতি বছরই এ দিনটির স্মৃতি জাগ্রত হয়।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র পরিচয়ঃ
‘ঈদ-এ মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে এ ধরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র শুভ আগমনে আনন্দিত হওয়া এবং এ অদ্বিতীয় নিয়ামত পাবার কারণে সৎকাজ ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা বুঝায়।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপন পদ্ধতিঃ
প্রিয় পাঠক, বর্তমান যুগে কেহ কেহ বলে থাকেন, আমাদের দেশে প্রচলিত মিলাদ আর পূর্বযুগের মিলাদ এক নয়। এ’দুয়ের পার্থক্যের একটা মেরুদন্ড নির্মাণ করে তারা প্রচলিত মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে অবৈধ, হারাম ইত্যাদি ফতোয়া দিয়ে থাকে। বিষয়টি খোলাসা করা প্রয়োজন। 

আমাদের দেশের মিলাদ-মাহফিল বলতে কি বুঝায়? বলবেন, মানুষদের একত্রিত হওয়া, সম্মেলন করা, জুলুস তথা শোভাযাত্রা বের করা, আনন্দ প্রকাশে না’তে রাসুল পরিবেশন করা, নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর শান-মান আলোচনা করা, কুরআন-খানি ও দরূদ শরীফ তেলাওয়াত করা, দান-সদকা ও তাবাররুকাতের ব্যবস্থা করা, লাইটিং ও ডেকোরেশন করে মাহফিলটাকে মনোগ্রাহী সাজে সাজানো সর্বোপরী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর প্রতি প্রেম ভালবাসা প্রদর্শন করা ইত্যাদি। এ-ই আমাদের দেশের বর্তমানকার মিলাদ মাহফিলের পদ্ধতি ও কর্মসূচী।
এবার পূর্ববর্তী কয়েকজন ওলামায়ে কেরামের প্রদত্ত পদ্ধতি তুলে ধরা হলো, যাদের গ্রহণযোগ্যতা সর্বকালে, সর্বযুগে এবং প্রশ্নাতীত।

জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ মোল্লা আলী ক্বারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর কর্মসূচীগুলোকে পর্যায়ক্রমে সাজিয়েছেন এভাবে, 
“বিভিন্ন খতম পড়া, অবিরাম কুরআন তেলাওয়াত করা, উচ্চ আওয়াজে না’ত বা গজল আবৃত্তি করা, বিভিন্ন প্রকারের বৈধ আনন্দ ও খুশি উদ্যাপন করা এবং উন্নত ভোজন সামগ্রী তথা তাবাররুকাতের এন্তেজাম করা”।

বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, 
“মিলাদুন্নবী” সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপনের করণীয়তার ক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে পূর্বে উল্লেখিত কার্যাদির উপর সীমাবদ্ধতা থাকা, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনের বিষয়টি বুঝা যায়। যেমন- কুরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা করা, পানাহার করানো, নবীর শান-মান সম্বলিত কবিতা তথা না’তে রাসুল আবৃত্তি করা এবং এমন সব আধ্যাতিক গজল পরিবেশন করা যেগুলো অন্তরাত্মাকে পারলৌকিক কল্যাণকর নেক আমল করতে তাড়িত করে, জাগিয়ে তোলে”।
হাফিজুল হাদিস আল্লামা শামসুদ্দীন মুহাম্মদ সাখাভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকেও মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের অনুরূপ পদ্ধতি পাওয়া যায়। তিনি মিশর এবং সিরিয়ার মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের পদ্ধতি বর্ণনা করার সময় উপরুক্ত কর্মসূচীগুলোর সাথে উত্তম পোশাক পরিধান করা, পানীয় ব্যবস্থা করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, আলোকসজ্জা করা ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেন।

হাদীস শাস্ত্রে আবু জুরআ রাজী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এঁর নাম জানেনা এরকম মুহাদ্দিস পৃথিবীতে এসেছে কিনা সন্দেহ। তিনি হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ ছিলেন। ৩৭৫ হিজরীতে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। সমসাময়িক এবং পরবর্তী যুগের সমস্ত মুহাদ্দিস তাঁর নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে বাধ্য হন।
মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর আনুষ্ঠানিকতার শরয়ী পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি যে কথা বলেছিলেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ‘ওলীমার আয়োজন করা এবং মানুষদেরকে আহার করানো সর্বাবস্থায়ই যখন মোস্তাহাব, তখন মর্যাদাপূর্ণ এই রবিউল আওয়াল মাসে নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর নবুয়্যতের নূর প্রকাশিত হওয়ার আনন্দের সাথে উপরোক্ত বিষয়গুলো সংযোজিত হলেতো আর এর বৈধতা ও বরকতময়তার ব্যাপারে প্রশ্নই থাকেনা। সলফে সালেহীন থেকে এ মতামতের বিপরীত কোন কিছুই আমার জানা নেই।

প্রিয় পাঠক! মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে যারা এ যুগের আবিস্কার বলে অপপ্রচার চালায় ইমাম আবু জুরআ রাজী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর কাছ থেকে তাদের নতুন করে সবক নেওয়া উচিত। তিনি দু’এক শতাব্দী আগের ইমাম নন বরং সেই হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ। তিনি বিশেষ পদ্ধতিতে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে বৈধ বলে ফতোয়া দিয়ে গেছেন।

সুতরাং মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপনের পদ্ধতিগুলো হল,
১. নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর আগমনের ঘটনাবলী ও শান-মান আলোচনা করা। 
২. সম্মেলন তথা জশ্নে জুলূছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর আয়োজন করা। 
৩. কুরআন তেলাওয়াত, না’তে রাসুল ও গজল আবৃত্তি করা। 
৪. বেশী বেশী নেক আমল করা। 
৫. মানুষদেরকে পানাহার করানো তথা তাবাররুক পরিবেশন ও দান-সদকা করা। 
৬. দরূদ শরীফ পাঠ করা। 
৭. আলোকসজ্জা করা। 
৮. সুগন্ধি ব্যবহার করা। 
৯. আনন্দ উদযাপন করা। 
১০. উন্নত বস্ত্র পরিধান করা ইত্যাদি।
প্রিয় পাঠক, নিম্নের কথাগুলো অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করুন। তাহলে দেখতে পাবেন, শুধু বর্তমান যুগেই নয় প্রত্যেক যুগেই ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপিত হয়ে আসছে। যা কোরআন হাদিস দ্বারা প্রমানিত।

মীলাদ (مِيلاد) শব্দটি আরবী। আরবী পরিভাষায় مصدر ميمى (মীম বিশিষ্ট মাসদার)। অন্য আরেকটি শব্দে مَوْلِدْ আছে। এর আভিধানিক অর্থ- জন্ম, জন্মস্থান। 
এ জন্যে মক্কা শরীফে মারওয়া পাহাড়ের পার্শ্বে ‘মাকতাবাতু মাক্কাহ্ আল- মুর্কারামা’ সাইন বোর্ড সম্বলিত দালানটিকে مَوْلِدُ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (মাওলেদুন্নবিয়্যি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বলা হয়। 

হযরত আহমদ মুহাম্মদ ইলিয়াস গনী তাঁর রচিত تاريخ مكة المصور গ্রন্থেরمَكْتَبَةُ مَكَّةَ الْمُكَرَّمَةِ (اَلْمَوْلُدِ) অংশে সচিত্র উল্লেখ করেন,
وَهِىَ دَارُ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ وُلِدَ فِيْهَا سَيِّدُنَا مُحَمَّدٌ خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ 

অর্থাৎ এটা হচ্ছে খাজা আবদুল্লাহ্ ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বাড়ী। এখানে আমাদের সরদার সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন।

পরিভাষায়, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর শুভ জন্ম বৃত্তান্তকে مِيلاد (মীলাদ) বলা হয়।

আমাদের সঠিক ইসলাম, যাকে আল্লাহ্ তা‘আলা اِنَّ الدِّيْنِ عِنْدَ اللهِ الْاِسْلاَمُ বলে আখ্যায়িত করেছেন, এ ইসলামের আলোকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর সম্মানার্থে মীলাদ শরীফ পাঠ করা, ক্বায়েম করা এবং হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মীলাদে পাকের কথা স্মরণ করে তাঁর সম্মানার্থে ক্বিয়াম করে সালাম পেশ করা শুধু বৈধ নয়; বরং উত্তম ও সাওয়াবের কাজ। যেহেতু, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মুহাব্বত করা এ উম্মতের উপর ফরয এবং সর্বাবস্থায় সম্মানের আক্বীদা রাখা, সম্মান প্রদর্শন করা ফরয; যেমন, ক্বোরআনুল করীমে নির্দেশ এসেছে- وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ তোমরা তাকে সাহায্য করবে এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে), সেহেতু মীলাদ-ক্বিয়ামের মাধ্যমে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সম্মান দেখানো উত্তম ও সাওয়াবের কাজ। এগুলোকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কর্মকান্ড হিসাবে আক্বীদা রাখা ফরয, যাকে ফিক্বহ্ শাস্ত্রের পরিভাষায়, ফরযে এ’তেক্বাদী (فرض اعتقادى) বলা হয়।

বর্তমান মীলাদ শরীফ উদযাপন করার ব্যাপারে বাতিল মতবাদীরা বিভিন্ন অনেক আপত্তি উত্থাপন করে। যেমন- ক্বোরআন, হাদীস ও সলফে সালেহীনের মধ্যে নেই ইত্যাদি অথচ ক্বোরআনুল করীমের পক্ষে প্রমাণ রয়েছে। পবিত্র ক্বোরআনে এ সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। 
আল্লাহ্ তা‘আলা ক্বোরআনকে تِبْيَانٌ لِكُلِّ شَئٍ (প্রত্যেক কিছুর বর্ণনাকারী) বলেছেন। আর ক্বোরআনে করীমে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর তা’যীম, প্রশংসা, গুণগান ও উত্তম চরিত্র ইত্যাদি বর্ণনার্থেও নাযিল হয়েছে। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন اِنَّكَ لَعَلٰى خُلُقٍ عَظِيْمٍ (নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর আছেন। 
[সূরা ক্বলম: আয়াত: ৪।]

আম্মা হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার বর্ণনায়خُلُقُه̒ صَلَّى اللهُ وَسَلَّمَ الْقُرْاٰنُ (হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর চরিত্র হচ্ছে ক্বোরআন) এসেছে। তাই মীলাদ ও ক্বিয়াম শরীফও হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর তা’যীমরূপী কর্মকান্ডের বাইরে নয়; এর মাধ্যমে পবিত্র ক্বোরআন নাযিল হবার অন্যতম উদ্দেশ্যও বাস্তবায়িত হয়।

এ নিবন্ধে ক্বোরআনের কিছু আয়াতে কারীমা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি, যেগুলো দ্বারা হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর মীলাদ শরীফ পালন করা শুধু বৈধ বলে প্রমাণিত হয় না, বরং সর্বশ্রেষ্ঠ আমল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
যেমন-
قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهٖ فَبِذلِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ ﴿٥٨﴾
তরজমা: হে হাবীব, আপনি বলুন, আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া এবং সেটারই উপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিৎ; তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়। 
[সূরা ইয়ূনুস: আয়াত-৫৮, কানযুল ঈমান।]

وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ
তরজমা: এবং তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, যখন তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ছিলো, তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন…আল আয়াত। 
[সূরা আল-ই ইমরান: আয়াত-১০৩, কানযুল ঈমান।]
وَإِذْ أَخَذَ اللَهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَآءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهٖ وَلَتَنصُرُنَّهُ ۚ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَىٰ ذٰلِكُمْ إِصْرِي ۖ قَالُوا أَقْرَرْنَا ۚ قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ ﴿٨١﴾
তরজমা: এবং স্মরণ করুন যখন আল্লাহ্ নবীগণের নিকট থেকে তাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমত প্রদান করবো, অতঃপর তাশরীফ আনবেন তোমাদের নিকট রসূল, যিনি তোমাদের কিতাবগুলোর সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁকে সাহায্য করবে।’ এরশাদ করলেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করলে এবং এ সম্পর্কে আমার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করলে?’ সবাই আরয করলো, ‘‘আমরা স্বীকার করলাম।’’ এরশাদ করলেন, ‘তবে (তোমরা!) একে অপরের উপর সাক্ষী হয়ে যাও এবং আমি নিজেই তোমাদের সাথে সাক্ষীদের মধ্যে রইলাম।’ 
[সূরা আল-ই ইমরান: আয়াত-৮১, কানযুল ঈমান।]
قَدْ جَآءَكُم مِّنَ اللَهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ ﴿١٥﴾
তরজমা: নিশ্চয় তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা নূর এসেছে এবং স্পষ্ট কিতাব। 
[সূরা মা-ইদাহ্, আয়াত-১৫।]
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿١٢٨﴾
তরজমা: নিশ্চয় তোমাদের নিকট তাশরীফ এনেছেন, তোমাদের মধ্য থেকে ওই রসূল, যাঁর নিকট তোমাদের কষ্টে পড়া কষ্টদায়ক, তোমাদের কাল্যাণ অতিমাত্রায় কামনাকারী, মু’মিনদের উপর পূর্ণ দয়ার্দ্র, দয়ালু। 
[সূরা আল-ই ইমরান, আয়াত- ১২৮।]
لَقَدْ مَنَّ اللَهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ ﴿١٦٤﴾
তরজমা: নিশ্চয় আল্লাহর মহা অনুগ্রহ হয়েছে মু’মিনদের উপর যে, তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন; যিনি তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দান করেন এবং তারা নিশ্চয় এর পূর্বে স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিলো। 
[সূরা আল-ই ইমরান, আয়াত- ১৬৪।]

ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন হুযূর-ই আক্রামের আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। 
যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন,
أَطِيعُوا اللَهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ
তরজমা: আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তাদের। 
[সূরা আল-ই ইমরান, আয়াত-৫৯, কানযুল ঈমান।]
অর্থাৎ: যাদের হাতে ঈমান-ইসলামের ক্ষমতা রয়েছে (তথা ইমাম, মুজতাহিদ, শরীয়তের আইনজ্ঞ, মাযহাবের ইমামগণ, তরিক্বতের ইমামগণ) তাঁদের আনুগত্য করো।
মূলত, আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর মহান নি’মাত। 
যেমন আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন-
وَاِنْ تَعُدُّوْا نِعْمَةَ اللهِ لاَ تُحْصُوْهَا
তরজমা: এবং যদি তোমরা আল্লাহর নি’মাতগুলো বর্ণনা করো, তবে সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। 
[সূরা ইব্রাহীম: আয়াত-৩৪, কানযুল ঈমান।]
অত্র আয়াতে বর্ণিত নি’মাতের কৃতজ্ঞতা আদায় করার জন্যে আল্লাহ অন্য আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা পালন করা অন্যতম ফরয। মিলাদে পাক উদ্যাপন করার মাধ্যমে আল্লাহর ওই নি’মাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। সুতরাং এটা আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে মহান ইবাদতে পরিণত। অতএব, এটা ইবাদত, বিদ‘আত নয়। আশ্চর্য! বাতিল ফিরক্বার লোকেরা এমন ইবাদতকে বলে বেড়ায়! তাদের এ কোন্ ধর্ম?

হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম হতে হযরত আব্দুল্লাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পর্যন্ত যুগে যুগে যাঁদের মাধ্যমে হুযূর-ই আক্রামের নূর মুবারক স্থানান্তরিত হয়েছিলো প্রত্যেকে ওই নূরে পাককে নিয়ে আপন পরিবেশে মিলাদ পালন করেছেন।
হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবা-ই কেরাম কর্তৃক যুগে যুগে এ মীলাদ পালিত হয়ে আসছে।

হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মীলাদ বর্ণনাপূর্বক হাদীস বর্ণনা করেন,
خَرَجْتُ مِنْ نِكَاحٍ وَلَمْ اَخْرُحْ مِنْ سَفَاحٍ مِنْ لَّدُنْ ادَمَ اِلى اَنْ وَلَدَنِىْ اَبِىْ وَاُمِّىْ
অর্থাৎ আমি ইসলামী নিকাহ’র তরীকা অনুযায়ী জন্মগ্রহণ করেছি এবং হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম হতে আমার পিতা-মাতা পর্যন্ত কারো নিকট কখনো ব্যভিচার পাওয়া যায় নি। 
[সূত্রঃ ত্বাবরানী, ইবনে আবী শায়বাহ্ দায়লামীর মুসনাদুল ফিরদাউস।]
হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের মীলাদ শরীফ নিজেই উদযাপন পূর্বক বর্ণনা করেন,
اَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ بْنِ هَاشِمِ بْنِ عَبْدِ مَنَافِ بْنِ قُصَىِّ بْنِ كِلاَبِ بْنِ مَرَّةَ بْنِ مَدْرَكَةَ بْنِ الْيَاسِ بْنِ مُضَرَ بْنِ يَزَارَ وَمَا افْتَرَقَ النَّاسُ فِرْقَتَيْنِ اِلاَّ جَعَلَنِىَ اللهُ فِىْ خَيْرِهِمَا ـ فَاُخْرَجْتُ مِنْ بَيْنِ اَبْوَيْنِ فَلَمْ يُصِبْنِىْ شَئٌ مِّنْ مَهْرِ الْجَاهِلَيَّةِ وَخَرَجْتُ مِنْ نِكَاحٍ وَّلَمْ اُخْرَجْ مِنْ سَفَاحٍ مِّنْ لَّدُنْ ادَمَ حَتّى انْتَهَيْتُ اِلى اَبِىْ وَاُمِّىْ فَاَنَا خَيْرُكُمْ نَفْسًا وَخَيْرُكُمْ اَبًا
[بَيْهَقِىُّ وَالْبِدَايَةُ وَالنِّهَايةُ] 

অর্থাৎ …সমস্ত মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত, আল্লাহ্ আমাকে তাদের মধ্যে উত্তম ভাগে রেখেছেন। আমি মাতাপিতার গর্ভে ও ঔরশে জন্মগ্রহণ করেছি। কিন্তু আমাকে জাহেলী যুগের কোন অশ্লীলতা স্পর্শ করেনি। আমি আমার মাতাপিতার বিবাহের ফসল। আমি কোন ব্যভিচারের ফসল নই। হযরত আদম থেকে বংশ পরস্পরায় আমার পিতামাতা পর্যন্ত আমি এসেছি। সুতরাং আমি তোমাদের মধ্যে সত্তার দিক দিয়েও উত্তম এবং তোমাদের মধ্যে পিতার দিক দিয়েও উত্তম।
[সূত্রঃ বায়হাক্বী, আল বিদায়া, ওয়ান্নিহায়া।]

হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের মীলাদ সম্পর্কে আরো বর্ণনা করেন,
اِنِّىْ عِنْدَ اللهِ مَكْنُوْنٌ خَاتَمُ النَّبِيْيْنَ وَاِنَّ ادَمَ لَمُنْجَدِلٌ فِىْ طِيْنَتِه وَسَأُ خُبِرُكُمْ بِاَوَّلِ اَمْرِىْ دَعْوَةُ اِبْرَاهِيْمَ وَبَشَارَةُ عِيْسى وَرُؤْيَا اُمِّى الَّتِىْ رَأَتْ حِيْنَ وَضَعَتْنِىْ قَدْ خَرَجَ لَهَا نُوْرٌ اَضَاءَ لَهَا مِنْهُ قُصُوْرُ الشَّامِ [اَلْبَيْهَقِىُّ وَمُسْنَدُ اَحْمَدَ] 

অর্থাৎ আমি আল্লাহর নিকট, শেষ নবী হিসেবে গোপন ছিলাম। তখন হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম তাঁর দৈহিক উপাদানে মিশ্রিত ছিলেন আর আমি এখন আমার প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে বলব- আমি হযরত ইব্রাহীমের দো‘আ, হযরত ঈসার সুসংবাদ এবং আমার মায়ের ওই চাক্ষুষ দৃশ্য, যা তিনি আমার জন্মের সময় দেখেছিলেন, তাঁর সামনে একটি নূর উদ্ভাসিত হয়েছিলো, যার আলোয় তিনি সিরিয়ার প্রাসাদগুলো দেখতে পেয়েছিলেন। 
[সূত্রঃ বায়হাক্বী, মুসনাদে ইমাম আহমদ।]

হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের মিলাদ বর্ণনাপূর্বক নিজ সৃষ্টির শুরু সম্পর্কে বর্ণনা করেন,

اِنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَئَلَ جِبْرَآئِيْلَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَقَالَ يَا جِبْرَائِيْلُ كَمْ عُمْرُكَ مِنَ السِّنِيْنِ؟ فَقَالَ يَارَسُوْلَ اللهِ لَسْتُ اَعْلَمُ غَيْرَ اَنَّ فِىْ الْحِجَابِ الرَّابِعِ نَجْمًا يَطْلَعُ فِىْ كُلِّ سَبْعِيْنَ اَلْفَ سَنَةٍ مَرَّةً وَرَأَيْتُه اِثْنَيْنِ وَسَبْعِيْنَ اَلْفَ مَرَّةٍ فَقَالَ يَا جِبْرَائِيْلُ وَعِزَّةِ رَبِّىْ جَلَّ جَلاَلُه اَنَا ذَالِكَ الْكَوْكَبُ [السيرة الحلبية نقل عن كتاب تشريفات رواه البخارى] 

অর্থাৎ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে জিব্রাঈল, তোমার বয়স কত? তিনি বললেন, আমি তো জানি না, তবে এতটুকু জানি যে, চতুর্থ পর্দায় একটি তারকা সত্তর হাজার বছরের মাথায় একবার উদিত হতো। আমি সেটাকে বাহাত্তর হাজার বার দেখেছি। অতঃপর হুযূর-ই আক্রাম বললেন, হে জিব্রাঈল আমার মহান রবের ইয্যাতের শপথ! আমি হলাম ওই তারকা। [সূত্রঃ সীরাতে হালবিয়া।]

এভাবে হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মীলাদ বর্ণনা পূর্বক অসংখ্য হাদীসে পাক রয়েছে। 

সাহাবা-ই কেরামের মধ্যেও ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপনের বিবরণ অসংখ্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত।

হযরত আবুদ্ দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত,

اِنَّه مَرَّ مَعَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلى بَيْتِ عَامِرٍ الْاَنْصَارِىِّ وَكَانَ يُعَلِّمُ وَقَائِعَ وَلاَدَتِه عَلَيْهِ الصَّلوةُ وَالسَّلاَمُ لِاَبْنَائِه وَعَشِيْرَتِه وَيَقُوْلُ هَذَا اَلْيَوْمُ فَقَالَ عَلَيْهِ الصَّلوة وَالسَّلاَمُ اَنَّ اللهَ فَتَحَ لَكَ اَبْوَابَ الرَّحْمَةِ وَالْمَلاَئِكَةُ كُلُّهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ لَكَ مَنْ فَعَلَ فِعْلَكَ نَجى نَجَاتَكَ ـ
[التنوير فى مولد البشير والنذير] 

অর্থাৎ নিশ্চয় তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর সাথে আমির আনসারীর ঘরে গেলেন। তিনি তখন তার পুত্রদের ও গোত্রীয় লোকদেরকে হুযূর-ই আক্রামের বেলাদত শরীফের বর্ণনাবলী শিক্ষা দিচ্ছিলেন। আর বলছিলেন, ‘আজকের এ দিন।’ অতঃপর হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম এরশাদ করেছেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা তোমার জন্য রহমতের দরজাগুলো খুলে দিয়েছেন, ফেরেশতারা সবাই তোমার জন্য মাগফিরাত কামনা করছে। যে ব্যক্তি তোমার মতো কাজ করবে, সে তোমার মতো মুক্তি পাবে।’’
[সূত্রঃ আত্তানভীর ফী মওলেদিল বশীরিন নাযীর।]

মীলাদুন্নবী উদযাপন প্রসঙ্গে ইমামগণের অভিমতঃ

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী ‘হাসানুল মাক্বসাদ ফী আমলিল মাওলেদ’ (حسن المقصد فى عمل المولد)-এর মধ্যে বর্ণনা করেন-

فَظَهَرَ لِىْ تَخْرِيْجُه عَلى اَصْلٍ اٰخَرَ وَهُوَ مَا اَخْرَجَهُ الْبَيْهَقِىُّ عَنْ اَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالى عَنْهُ اَنَّ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَّ عَنْ نَفْسِه بَعْدَ النَّبُوَّةَ مَعَ قَدْ وَرَدَ عَنْ جَدِّه عَبْدِ الْمُطَّلِبِ عَقَّ عَنْهُ فِىْ سَابِعِ وِلاَدَتِهِ وَالْعَقِيْقَةُ لاَ تُزَادُ مَرَّةً ثَانِيَةً فَيُحْمَلُ عَلى اَنَّ الَّذِىْ فَعَلَهُ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِظْهَارُ الشُّكْرِ عَلى اِيْجَادِ اللهِ اِيَّاهُ رَحْمَةً لِّلْعَالَمِيْنَ وَتَشْرِيْعِ لِاُمَّتِه كَمَا كَانَ يُصَلِّىْ عَلى نَفْسِه لِذَالِكَ فَيَسْتَحِبُّ لَنَا اَيْضًا اِظْهَارُ الشَّكْرِ بِمَوْلِدِه بِالْاِجْتِمَاعِ وَاِطْعَامِ اَلطَّعَامِ وَنَحْوِ ذَالِكَ بِوُجُوْهِ الْقُرْبَاتِ وَاِظْهَارِ الْمُسَرَّاتِ

অর্থাৎ আমার নিকট এ হাদীসের বর্ণনার জন্য একটি সনদ প্রকাশ পেয়েছে। তা হচ্ছে ওই হাদীস, যা ইমাম বায়হাক্বী হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের আক্বীক্বা নিজে করেছেন নুবূয়ত প্রকাশের পর। এতদ্সত্ত্বেও তাঁর দাদা খাজা আবদুল মুত্তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর বেলাদত শরীফের সপ্তম দিনে তাঁর পক্ষ থেকে আক্বীক্বা করেছেন অথচ আক্বীক্বা একবারের বেশী করা হয় না। সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যা করেছেন, তার ব্যাখ্যা এটা দেওয়া হবে যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে রাহমাতুল্লিল আলামীন হিসেবে পয়দা করেছেন বিধায় সেটার শোকরিয়া প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে তা করেছেন আর তেমন কাজ শরীয়তের বিধিভুক্ত করার জন্য, যেমন তিনি তজ্জন্য নিজে দুরূদ পড়েছেন। সুতরাং আমাদের জন্যও হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এঁর মীলাদ শরীফের শোকরিয়া আদায় করা মুস্তাহাব; তাও মাহফিলের আয়োজন ও খানা খাওয়ানো ইত্যাদির মাধ্যমে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও তাঁর নি’মাত প্রাপ্তিতে খুশী প্রকাশের নিমিত্তে।)

পাক ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ শায়খ আবদুল হক্ব মুহাদ্দিস দেহলভী তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘মা-সাবাতা বিস্সুন্নাহ্’ (ما ثبت بالسنة)-এর মধ্যে এভাবে বর্ণনা করেন-

لاَيَزَالُ اَهْلُ الْاِسْلاَمِ يَحْتَفِلُوْنَ بِشَهْرِ مَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَعْمَلُوْنَ اْلَولَائِمَ وَيَتَصَدَّقُوْنَ فِىْ لَيَالِيْهِ بِاَنْوَاعِ الصَّدَقَاتِ وَيَظْهِرُوْنَ السُّرُوْرَ فِى الْمَبَرَّاتِ وَيَعْتَنُوْنَ بِقِرَأَءِ مَوْلِدِهِ الْكَرِيْمِ (مَاثَبَتَ بِالسُّنَّةِ)

অর্থাৎ মুসলমানগণ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাসে মাহফিল করে আসছেন, খাবারের আয়োজন করেন, সেটার রাতগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সাদক্বাহ্-খায়রাত করেন এবং খুশী প্রকাশ করেন দান-খায়রাত ও মীলাদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে।
এভাবে মিশরও সিরিয়ার মধ্যে মীলাদ পালন প্রসঙ্গে فاكثر هم بذالك عناية اهل مصروالشام অর্থাৎ সুতরাং মিশর ও সিরিয়াবাসীরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তা পালন করে থাকে।

দেওবন্দীদের অন্যতম মৌলভী আশরাফ আলী থানভী কর্তৃক রচিত ‘মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’ নামক কিতাবের ১৯২ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেন, ‘ক্বোরআনের আয়াত- ذَكِّرْهُمْ بِاَيَّامِ اللهِ (তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিন আল্লাহর দিনগুলোকে)’-এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেন, ‘‘এ কথা সুস্পষ্ট হল যে, নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি-আনন্দ করা বৈধ। শুধু তা নয়, বরং তা বরকত হাসিলেরও বড় উপায়।
রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর ওস্তাদ মীলাদ সম্পর্কে বলেন, এ কথা হক ও সত্য যে, হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মীলাদ শরীফ পালন এবং ঈসালে সাওয়াবের আয়োজন করা মানবের পরিপূর্ণ কল্যাণের একটি সোপান। বাস্তব এ যে, হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মীলাদ পালন করার মধ্যে এবং ঈসালে সাওয়াব উপলক্ষে ফাতেহা পড়া আপন মীলাদের খুশি উদ্যাপন করেছেন পুরোটাই মানবের জন্য মঙ্গল।
[সূত্রঃ শেফাউল সায়ের, কৃত. শাহ্ আবদুল গণী দেহলভী।]

উপরোক্ত দলীলাদির আলোকে সাব্যস্ত হল যে, ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করা এ উম্মতের জন্য সর্বোত্তম ইবাদত; যার মাধ্যমে আল্লাহর মহান নি’মাতের শোকর আদায় হয়। আর নি’মাতের শোকর আদায়ের জন্য স্বয়ং আল্লাহরই হুকুম বিদ্যমান। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন, وَاشْكُرُوْا لِىْ وَلاَتَكْفُرُوْنَ অর্থাৎ ‘‘তোমরা আমার নি’মাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং নাফরমানী করো না।’’ 
সুতরাং যারা আল্লাহর মহান নি’মাতের শোকর আদায়ার্থে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করে, তারা আল্লাহর হুকুমই বাস্তবায়ন করে। আর আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন ও পালন তারাই করবে, যারা ঈমানদার। তাই ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করা ঈমানদারের কাজ ও পুণ্যময় আমল, যা করলে পুণ্য বা সাওয়াব পাওয়া যায়। আর যারা ঈমানদার নয়, তারা ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করার প্রশ্নই আসে না। অবশ্য যারা ঈমানদার নয়, তারা যদি ভক্তি সহকারে তা পালন করে, তবে তারা অবশ্যই সুফল পাবে। যেমন, হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা আবূ লাহাবকে হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু স্বপ্নে দেখলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার অবস্থা কি? সে উত্তরে বললো, ‘‘ঈমান ছাড়া মৃত্যুবরণের কারণে বর্তমানে আমার অবস্থান জাহান্নামে, কিন্তু প্রতি সোমবার রাতে আমার আযাব হালকা হয়ে যায় এবং আমি আমার এ দু‘আঙ্গুল থেকে ঠান্ডা পানি পান করতে থাকি। আর এ আযাব হালকা হওয়া এবং ঠান্ডা পানি পাবার কারণ হলো নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের বেলাদত শরীফের শুভ সংবাদ দিয়ে আমার দাসী সুয়াইবা আমাকে অবহিত করলে আমি তাকে




ইসলাম ও জীবন - পাতার আরও খবর
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
প্রকাশক ও সম্পাদক :---
"মা নীড়" ১৩২/৩ আহমদবাগ, সবুজবাগ, ঢাকা-১২১৪
ফোন : +৮৮-০২-৭২৭৫১০৭, মোবাইল : ০১৭৩৯-৩৬০৮৬৩, ই-মেইল : sunnibarta@gmail.com